৪৭০০ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ক্ষতিগ্রস্ত এবারের বন্যায়

এবারের বন্যায় সারা দেশে ৪ হাজার ৭০৮টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তর প্রকাশিত সর্বশেষ দুর্যোগ পরিস্থিতি প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে। এর মধ্যে ৪ হাজার ৬৮২টি প্রতিষ্ঠান আংশিক এবং ২৬টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান সম্পূর্ণভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, বন্যায় সবচেয়ে বেশি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে গাইবান্ধা জেলায়। সেখানে মোট ১ হাজার ৫২টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এর মধ্যে ১ হাজার ৩৭টি আংশিক ও ১৫টি সম্পূর্ণ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত প্রতিষ্ঠানের সংখ্যার দিক থেকে দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে কুড়িগ্রাম জেলা। সেখানে ১ হাজার ২৮টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এর মধ্যে দুটি প্রতিষ্ঠান সম্পূর্ণভাবে বিলীন হয়ে গেছে। জামালপুরে ক্ষতিগ্রস্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সংখ্যা ৮৬৭টি। এর বাইরে সুনামগঞ্জে ৫৫৫টি, সিরাজগঞ্জে ২৬৩, বগুড়ায় ১৯৪, শেরপুরে ১৪৬, টাঙ্গাইলে ১৭০, সিলেটে ৮৯, মানিকগঞ্জে ৮১, ফরিদপুরে ৫২, রাজবাড়ীতে ১৬, মাদারীপুরে ১১, হবিগঞ্জে ১০, শরীয়তপুরে আট ও মুন্সীগঞ্জে একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বন্যার কবলে পড়ে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে বিদ্যালয়ের আসবাবসহ বিভিন্ন শিক্ষা উপকরণ। কোথাও কোথাও ভাঙনে তলিয়ে যাচ্ছে খোদ বিদ্যালয় ভবনই। বন্যার কারণে পানিবন্দি হয়ে পড়ায় বিদ্যালয়ে যেতে পারছেন না শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা।

সিরাজগঞ্জ জেলার শিক্ষা ও প্রাথমিক শিক্ষা কার্যালয়ে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বন্যার কারণে পাঠদান বন্ধ হওয়া শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মধ্যে ২১৫টি প্রাথমিক বিদ্যালয় এবং ৬৭টি মাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান রয়েছে। আর নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে ছয়টি প্রাথমিক ও একটি মাধ্যমিক বিদ্যালয়। বন্যাকবলিত অন্যান্য এলাকায় কথা বলে একই চিত্র পাওয়া গেছে। এ অবস্থা থেকে দ্রুত উত্তরণ না ঘটাতে পারলে শিক্ষার্থী ঝরে পড়ার আশঙ্কা শিক্ষাসংশ্লিষ্টদের।

সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা ও গণসাক্ষরতা অভিযানের নির্বাহী পরিচালক রাশেদা কে চৌধুরী বলেন, দেশে বন্যা এখন নিয়মিত ঘটনা। যদিও দুঃখজনক বিষয় হলো, এ ধরনের দুর্যোগ মোকাবেলায় অধিকাংশ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেরই কোনো ধরনের প্রস্তুতি থাকে না। এতে ক্ষতির আকারটা বড় হয়। এছাড়া দুর্যোগ-পরবর্তী সময়েও সংকট নিরসনে দ্রুত কোনো উদ্যোগ নেয়া হয় না। ক্ষতিগ্রস্ত ভবন পুনর্নির্মাণে দীর্ঘসূত্রতা পরিলক্ষিত হয়। ফলে শিক্ষার্থী ঝরে পড়ার হার বেড়ে যায়।

এদিকে, মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তাদের পাঠানো তথ্যের ভিত্তিতে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ক্ষতির প্রতিবেদন তৈরি করছে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তর (মাউশি) ও প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর (ডিপিই)। মাউশির সর্বশেষ হিসাব অনুযায়ী, এখন পর্যন্ত ১ হাজার ৫৫৭টি নিম্ন মাধ্যমিক, মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান পানিবন্দি ও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

মাউশির নয়টি আঞ্চলিক কার্যালয় থেকে ৬৪ জেলার বন্যার ক্ষয়ক্ষতির বিষয়ে গত বৃহস্পতিবার প্রাথমিক প্রতিবেদন পাঠানো হয়েছে। এতে দেখা যায়, ময়মনসিংহ অঞ্চলের বিভিন্ন জেলায় ৫৭০টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি প্রতিষ্ঠান ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে জামালপুরে, ৪০৮টি। অন্যান্য আঞ্চলিক কার্যালয় ও বিভাগের মধ্যে রাজশাহীতে ১৩৫টি, চট্টগ্রামে ৩৬, ঢাকা অঞ্চলে ৩৫, সিলেটে ২৫২ এবং রংপুর অঞ্চলে ৫২৯টি প্রতিষ্ঠান ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

মাউশির উপপরিচালক রুহুল মমিন বলেন, বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোয় পাঠদান বন্ধ রয়েছে। আবার কিছু প্রতিষ্ঠান আশ্রয়কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহার করায় পাঠদান দেয়া সম্ভব হচ্ছে না। মাঠপর্যায় থেকে প্রতিদিনই হালনাগাদ তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে। যত দ্রুত সম্ভব এ সমস্যা থেকে উত্তরণে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

অন্যদিকে ডিপিই বলছে, এখন পর্যন্ত দেশের প্রায় দেড় হাজার প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ক্লাস পরীক্ষা বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অবকাঠামো নির্মাণের কাজ পরিচালিত হয় শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের (ইইডি) অধীনে। এ বিষয়ে ইইডির প্রধান প্রকৌশলী দেওয়ান মো. হানজালা বলেন, প্রতি বছরই বন্যায় দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ক্ষতির শিকার হয়। অনেক প্রতিষ্ঠানের ভবন বিলীন হয়ে যায়। মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তারা এসব তথ্য সংগ্রহ করে আমাদের কাছে পাঠান। আমরা সে আলোকে অর্থ বরাদ্দ দিয়ে যত দ্রুত সম্ভব সংস্কার, মেরামত ও পুনর্নির্মাণের ব্যবস্থা গ্রহণ করি। এবারো একইভাবে তথ্য সংগ্রহের কাজ চলছে। দুর্যোগ-পরবর্তী সময়ে যত দ্রুত সম্ভব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো সচল করার উদ্যোগ নেয়া হবে।