অস্থিরতা শিক্ষাঙ্গনে

দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে নানা ইস্যুতে হচ্ছে একের পর এক আন্দোলন। কখনো শিক্ষার্থী, কখনো শিক্ষক আবার কখনো শিক্ষক-শিক্ষার্থী একত্রে আন্দোলনগুলোর নেতৃত্ব দিচ্ছেন।

সারা দেশে সরকারি ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে আলাদা আলাদা ইস্যুতে আন্দোলন কার্যক্রম চলমান রয়েছে। সর্বপরি দেশের শিক্ষাঙ্গনগুলোতে বিরাজ করছে অস্থিরতা, রয়েছে নানা শঙ্কা।

সর্বশেষ আন্দোলনের কঠোর ডাক দিয়েছে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট)’র শিক্ষার্থীরা। আবরার হত্যার পর ১০ দফা দাবির ভিত্ততে তারা আন্দোলন শুরু করে। এক পর্যায়ে বুয়েট প্রশাসনের সাথে আলোচনার ভিত্তিতে মাঠ পর্যায়ের আন্দোলন স্থগিতের ঘোষণা দেয় তারা। আন্দোলন প্রত্যাহারের ১৩ দিনের মাথায় গত মঙ্গলবার আবারো আন্দোলনে নামেন শিক্ষার্থীরা। চূড়ান্ত ফলাফল না দেখা পর্যন্ত আন্দোলন চালিয়ে যাবেন বলেও ঘোষণা দেন তারা।

উন্নয়ন প্রকল্পে দুর্নীতির অভিযোগে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের (জাবি) উপাচার্য অধ্যাপক ফারজানা ইসলামের অপসারণের দাবিতে আন্দোলন অব্যাহত রয়েছে বিশ্ববিদ্যালয়টিতে। ‘উপাচার্য অপসারণ মঞ্চ’ বানিয়ে সেখানে আন্দোলন করছেন শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের একাংশ। আন্দোলনের অংশ হিসেবে গত সোমবার এক দিনের ধর্মঘট পালন করেন তারা।

এদিকে মঙ্গলবার সকাল আটটা থেকে বিকেল চারটা পর্যন্ত ‘দুর্নীতির বিরুদ্ধে জাহাঙ্গীরনগর’ ব্যানারে বিশ্ববিদ্যালয়ের নতুন ও পুরোনো প্রশাসনিক ভবনের সামনে অবস্থান নিয়ে অবরোধ কর্মসূচি পালন করেন শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা। অবরোধের কারণে কর্মকর্তা-কর্মচারীরা কার্যালয়ে প্রবেশ করতে পারেননি। উপাচার্য, সহ-উপাচার্য, রেজিস্ট্রারসহ বিশ্ববিদ্যালয়ের শীর্ষ কর্মকর্তাদের কেউই কার্যালয়ে যাননি। উপাচার্য অপসারণ না হওয়া পর্যন্ত অবরোধ কর্মসূচি চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দেন ‘দুর্নীতির বিরুদ্ধে জাহাঙ্গীরনগর’ প্ল্যাটফর্মের সমন্বয়ক অধ্যাপক রায়হান রাইন।

পাবনা বিজ্ঞান ও প্রযুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের (পাবিপ্রবি) ইতিহাস বিভাগে শিক্ষক নিয়োগ নিয়ে ওই বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের বিরুদ্ধে এক চাকরি প্রার্থীর কাছ থেকে ৮ লাখ টাকা ঘুষগ্রহণের অভিযোগ ওঠে। এ নিয়ে ফেসবুকে স্ট্যাটাস দেওয়া তিন শিক্ষককে শোকজ করে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। সেই শোকজ প্রত্যাহারের দাবিসহ ১২ দফা দাবিতে আন্দোলন চলছে সেখানে। শিক্ষার্থীদের আন্দোলনে উত্তাল পাবিপ্রবি। এর ফলে ক্লাস পরীক্ষাসহ সকল একাডেমিক ও প্রশাসনিক কার্যক্রম বন্ধ রয়েছে।

উপাচার্যের (ভিসি) পদত্যাগসহ ৯ দফা দাবিতে আন্দোলনের ঘোষণা দিয়েছেন বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান আহসানউল্লাহ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা। প্রায় সকল বিভাগের সাধারণ শিক্ষার্থীরা এ আন্দোলনে যোগ দিয়েছেন।

মঙ্গলবার আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা বলেন, ভিসির পদত্যাগ ছাড়া বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক ও প্রশাসনিক ভবনে তালা ঝুলিয়ে রাখা হবে। প্রশাসনিক সকল দায়িত্ব থেকে তাকে (ভিসি) না সরানো পর্যন্ত এ আন্দোলন অব্যাহত থাকবে। কোনো অবৈধ ব্যক্তিকে শিক্ষার্থীরা ভিসি হিসেবে মেনে নেবেন না বলেও ঘোষণা দেয়া হয়েছে।

তারা আরও বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক ও প্রশাসনিক ভবনসহ বিভিন্ন স্থানে তালা ঝুলিয়ে দেয়া হয়েছে। দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত সেসব স্থানে তালা ঝুলিয়ে রাখা হবে বলেও ঘোষণা দেয়া হয়েছে।

অনিয়ম, দুর্নীতিসহ নানা অভিযোগে গত ১৯ সেপ্টেম্বর গোপালগঞ্জের বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে ভিসি অধ্যাপক ড. খোন্দকার নাসির উদ্দিনের বিরুদ্ধে আন্দোলনে নামেন শিক্ষার্থীরা। প্রবল আন্দোলনের মুখে ১ অক্টোবর বিকেলে ভিসি পদত্যাগ করেন। এর আগে ১১ সেপ্টেম্বের আইন বিভাগের শিক্ষার্থী ফাতেমা-তুজ জিনিয়াকে অন্যায়ভাবে বহিস্কার করে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। এ নিয়ে ফেসবুকে সমালোচনার ঝড় ওঠে। ১৮ সেপ্টেম্বর বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন জিনিয়ার বহিষ্কার আদেশ প্রত্যাহার করে নেয়। এর পর শুরু হয় ভিসি বিরোধী আন্দোলন। ২১ সেপ্টেম্বর আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের উপর ভিসির সমর্থকরা হামলা করলে ২০ শিক্ষার্থী আহত হন। এ নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন গঠিত তদন্ত কমিটি ভিসিকে প্রত্যাহারের সুপারিশ করে তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল করে।

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের (রাবি) উপ-উপাচার্য অধ্যাপক চোধুরী মোহাম্মদ জাকারিয়ার বিরুদ্ধে নিয়োগ বাণিজ্যের অভিযোগে ৩ অক্টোবর থেকে তার পদত্যাগের দাবিতে আন্দোলনে নামেন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা। এছাড়া রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়সহ দেশের সব উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে লাগামহীন দুর্নীতির বিরুদ্ধে প্রতিবাদস্বরূপ খালি পায়ে শহীদ ড. শামসুজ্জোহা চত্বরে অবস্থান কর্মসূচি পালন করেছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. ফরিদ খান। সকাল সোয়া ১০টা থেকে দুপুর ১টা পর্যন্ত কর্মসূচি পালন করেন তিনি। তার হাতের প্ল্যাকার্ডে লেখা দেখা যায়- দুর্নীতিমুক্ত শিক্ষাঙ্গন চাই, শিক্ষকের মর্যাদা নিয়ে বাঁচতে চাই।

এদিকে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ সংশ্লিষ্ট সকলকে আন্দোলনের নামে ক্যাম্পাসে বিরাজমান শিক্ষার সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ পরিবেশ বিঘ্নিত করাসহ যে কোনো ধরণের অপতৎপরতা থেকে বিরত থাকার আহ্বান জানায়। এ মর্মে প্রকাশিত এক বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, ‘ভিত্তিহীন অভিযোগের মাধ্যমে এ রকম কর্মসূচির নামে কোনো ব্যক্তি কিংবা গোষ্ঠী ক্যাম্পাসে অনাকাঙ্ক্ষিত ও বিশৃঙ্খল পরিস্থিতির সৃষ্টি করলে তার দায়ভার কথিত আন্দোলনকারীদের ওপরই বর্তাবে।’

চলতি বছরের মার্চে আন্দোলনে অচল হয়ে পড়ে বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়। এ বছর মহান স্বাধীনতা ও জাতীয় দিবসের আয়োজনকে কেন্দ্র করে সূত্রপাত ঘটে আন্দোলনের। ওই দিন আরেক অনুষ্ঠানে উপাচার্য শিক্ষার্থীদের ‘রাজাকারের বাচ্চা’ বলেছেন বলে অভিযোগ ওঠে। শিক্ষার্থীরা উপাচার্যকে প্রকাশ্যে ক্ষমা চাওয়াসহ ১০ দফা দাবিতে তীব্র আন্দোলন গড়ে তোলেন।