প্রাথমিক বিদ্যালয় : ‘উল্টোপিঠ’ শহর গ্রামে

সারাদেশের গ্রাম পর্যায়ে রয়েছে অসংখ্য প্রাথমিক বিদ্যালয়। কিছুদূর পর পরই যেখানে একটি করে প্রাইমারি স্কুল দেখা যায় সেক্ষেত্রে ভিন্ন ঢাকা মহানগরী। এ যেনো প্রাথমিকের উল্টোপিঠের দৃশ্য।

দীর্ঘ দিন ধরে অভিভাবকদের নেতিবাচক মনোভাবের কারণে রাজধানীর অনেক সরকারি প্রাইমারি স্কুল পরিণত হয়েছে গরিবের স্কুলে। নানা কারণে এখন আর চাইলেও অনেকে এসব স্কুলে সন্তান ভর্তি করানোর সাহস করেন না। অনেক বড় এলাকায় আদৌ নেই কোনো সরকারি প্রাইমারি স্কুল।

ঢাকা মহানগরীতে সরকারি প্রাইমারি স্কুলের সংখ্যা ৩৪২টি। ঢাকা শহরে পৌনে দুই কোটি জনসংখ্যার বিপরীতে এ সংখ্যা কোনো হিসেবের মধ্যে আসে না। তার পরও এসব অনেক স্কুলে রয়েছে শিক্ষার্থী সঙ্কট বিশেষ করে পুরান ঢাকার অনেক স্কুলে। পুরান ঢাকার অনেক এলাকায় স্বল্প দূরত্বে বেশ কিছু সরকারি প্রাইমারি স্কুল রয়েছে। কিন্তু এসব অনেক স্কুলে শিক্ষার্থী সঙ্কটের মূলে জনসংখ্যার সমস্যা নয়, বরং সমস্যা অন্যত্র। মূলত সচ্ছল ও শিক্ষিত অনেক অভিভাবকদের নেতিবাচক মনোভাবের কারণে রাজধানীর অনেক এলাকার সরকারি প্রাইমারি স্কুল আগেই গরিব আর নিম্নবিত্তদের স্কুলে পরিণত হয়েছে

রাজধানীতে বিভিন্ন এলাকায় সরকারি প্রাইমারি স্কুলের সঙ্কট, অনেক স্কুলে মান ও পরিবেশের সঙ্কট এবং অভিভাবকদের নেতিবাচক মানসিকতার কারণে রাজধানীতে প্রাথমিকের গোটা শিক্ষাব্যবস্থা মূলত পরিচালিত হচ্ছে বেসরকারি খাতে।

রাজধানীর প্রায় সব বেসরকারি স্কুল আবাসিক ভবনে পরিচালিত হওয়ায় কোমলমতি শিশুরা সেখানে পায় না খেলাধুলার উন্মুক্ত কোনো পরিবেশ। সরকারি স্কুলের সঙ্কটের কারণে বেসরকারি স্কুলেও সন্তান ভর্তি নিয়ে প্রতি বছর অভিভাবকদের অবতীর্ণ হতে হয় ভর্তিযুদ্ধে। রয়েছে নানা ধরনের দুশ্চিন্তা আর হয়রানি।

অনেক অভিভাবক মনে করেন বেসরকারি অনেক স্কুলের শিক্ষকদের তুলনায় সরকারি স্কুলের শিক্ষকদের মান এখনো অনেক ভালো। সরকারি প্রাইমারি স্কুলের শিক্ষকদের শিক্ষক হতে হলে একটি নির্দিষ্ট মান অর্জন করতে হয় এবং পরীক্ষা দিয়ে সুযোগ পেতে হয়। কিন্তু বেসরকারি অনেক স্কুলের শিক্ষকদের তেমন কোনো মান নেই। তা ছাড়া বেসরকারি স্কুলে পড়ানোর মতো আর্থিক সচ্ছলতাও তার কম। সে কারণে সরকারি প্রাইমারি স্কুলে সন্তান ভর্তির সিদ্ধান্ত নিয়েও তিনি শেষ পর্যন্ত ভর্তি করাতে সাহস করেন না।

এক দিকে স্কুল থাকলেও নানা কারণে রাজধানীর অনেক অভিভাবক তাদের সন্তানদের সরকারি স্কুলে ভর্তি করান না নানা কারণে। আবার অনেক এলাকায় একেবারেই কোনো স্কুল নেই।

রাজধানীর অনেক এলাকার বিদ্যমান সরকারি প্রাইমারি স্কুলের চিত্র নাজুক হলেও অনেক এলাকায় অনেক সরকারি স্কুলে শিক্ষার্থীদের অনেক ভিড় রয়েছে এবং শিক্ষিত ও সচ্ছল পরিবারের অভিভাবকরা তাদের সন্তানরা এসব স্কুলে ভর্তি করাচ্ছেন।

রাজধানীতে সরকারি প্রাইমারি স্কুলের তীব্র সঙ্কট থাকলেও দেশের গ্রামের চিত্র সম্পূর্ণ বিপরীত। অনেক গ্রামে হাঁটা পথে প্রতি ১৫ মিনিট পরপর একটি করে সরকারি প্রাইমারি স্কুল দেখা যায়। অনেক স্কুলে রয়েছে তীব্র শিক্ষার্থী সঙ্কট। কয়েক দিন আগে কিশোরগঞ্জের পাকুন্দিয়া এলাকায় ইউএনও একটি সরকারি প্রাইমারি স্কুলে আকস্মিক সফরে গিয়ে শিক্ষক ও শিক্ষার্থী কাউকেই পাননি।

বর্তমানে দেশে সরকারি প্রাইমারি স্কুলের সংখ্যা ৬৫ হাজার ৯৯টি। ২০১৪ সালে ২৬ হাজার বেসরকারি প্রাইমারি স্কুল সরকারীকরণ করা হয়। এসব অনেক স্কুলের শিক্ষকদের মান নিয়ে তখন তীব্র প্রশ্ন ওঠে।

প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের অধীনে তৃতীয় প্রাথমিক শিক্ষা উন্নয়ন কর্মসূচির আওতায় বিদ্যালয়বিহীন এলাকায় এক হাজার ৫০০ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় স্থাপনের প্রকল্প শেষ হলেও রাজধানীতে হাতেগোনা কয়েকটি স্কুল প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে।

প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক সোহেল আহমেদ বলেন, বিদ্যালয়বিহীন এলাকায় আরো এক হাজার নতুন বিদ্যালয় স্থাপনের প্রকল্প গ্রহণ করা হয়েছে। তবে রাজধানীতে এসব স্কুল প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে কোনো অগ্রাধিকার আছে কি না জানতে চাইলে তিনি বলেন, দেখে বলতে হবে। ফোনে সব বলা যাবে না।