যুগোপযোগী করতে হবে প্রাথমিক শিক্ষাকে

দেশ স্বাধীন হওয়ার পর থেকে দারিদ্র্যমোচন ও সামাজিক ন্যায় প্রতিষ্ঠার পথে জনসংখ্যার আকারই প্রধান বাধা বলে চিহ্নিত হয়ে আসছিল। অফিস-আদালত, নগর-বন্দর, পথ-ঘাট, কল-কারখানা, নাগরিক সেবা, ব্যবসা-বাণিজ্য বা কর্মসংস্থান- সবখানেই বর্ধনশীল জনসংখ্যার চাপ দেশের জন্য নিঃসন্দেহে বড় একটি চ্যালেঞ্জ বলেই গণ্য হয়ে এসেছে। বিশ্ববাজারের বদলে যাওয়া চরিত্র ও দেশের ক্রমবিকাশমান অর্থনীতির আকার জনশক্তির ধারণায় নতুন মাত্রা যুক্ত করেছে। জনশক্তির ভিত্তি হয়ে উঠেছে তারুণ্য, দক্ষতা ও জ্ঞান। বিশ্বের নানা প্রান্তেই শুরু হয়েছে মানবসম্পদ আহরণের প্রতিযোগিতা। কারণ এ মানবসম্পদ যে কোনো দেশের শিল্প, কৃষি, ব্যবসা-বাণিজ্যের ক্যানভাসকে প্রশস্ত করে। দেশ হয় সমৃদ্ধ হতে সমৃদ্ধতর।

অন্যদিকে, মুক্তিযুদ্ধের লক্ষ্যই ছিল একটি বৈষম্যহীন, আধুনিক ও মানবিক জাতিরাষ্ট্র গঠন। আর এ লক্ষ্যে অগ্রাধিকার নিরূপণে জাতির পিতা বৈষম্যহীন শিক্ষাব্যবস্থাকেই এগিয়ে রাখেন। গ্রাম ও দারিদ্র্যকে উপেক্ষা করার ঔপনিবেশিক মনস্তত্ত্বের গণ্ডি পেরিয়ে আমজনতার দোরগোড়ায় রাষ্ট্রীয় শিক্ষাসেবার সুযোগ পৌঁছে দেয়ার অঙ্গীকারে বঙ্গবন্ধু প্রাথমিক শিক্ষাকে জাতীয়করণ করেন। ড. কুদরাত-ই-খুদা শিক্ষা কমিশন একটা গণমুখী শিক্ষাকাঠামো প্রবর্তনের লক্ষ্যে একটি যুগোপযোগী কর্মপরিকল্পনা প্রণয়ন করে।

বিজ্ঞানমনস্ক, অসাম্প্রদায়িক, প্রগতিশীল নাগরিকসমাজ একটি সুস্থ ভবিষ্যৎ নির্মাণ করবে- শিক্ষা কমিশনের রিপোর্টে নিহিত ছিল এমনই দার্শনিক প্রতিশ্রুতি। সমতাভিত্তিক, ন্যায়পরায়ণ সমাজ কাঠামোই আরাধ্য গন্তব্যের পথরেখা তৈরি করতে পারে- এমন অগ্রবর্তী ভাবনা সদ্যস্বাধীন দেশের পথচলার নৈতিক প্রেরণা হবে; সেটি স্বাভাবিক, কাঙ্ক্ষিত ও প্রত্যাশিত।

কিন্তু বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ড সদ্যস্বাধীন দেশের এগিয়ে চলার পথনকশা তছনছ করে দেয়। কার্যত রাষ্ট্রব্যবস্থা লক্ষ্যহীন, গন্তব্যহীন হয়ে পড়ে। সামরিক ও বেসামরিক আমলাতন্ত্র গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোর বুনিয়াদকে একে একে ধ্বংস করে ফেলে। রাষ্ট্রযন্ত্রের নৈতিক দিকভ্রষ্টতা, রাজনৈতিক দর্শনে অস্পষ্টতা, সিদ্ধান্তের অস্থিরতা ও পারিপার্শ্বিক অনিশ্চয়তায় সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হয় রাষ্ট্রের সেবা খাতগুলো।

মুক্তিযুদ্ধের আদর্শের উল্টোপথে রাষ্ট্র ঔপনিবেশিক ও রক্ষণশীল ভাবধারায় পরিচালিত হতে থাকে। রাষ্ট্রের লক্ষ্য কী হবে বা রাষ্ট্রের সঙ্গে নাগরিকের সম্পর্কের আদল কেমন হবে বা সাধারণ মানুষের অর্থনৈতিক মুক্তির স্বপ্ন বাস্তবায়িত করতে কী ধরনের কাঠামোগত পরিবর্তন প্রয়োজন- সে বিষয়ে কোনো পরিকল্পনা বা ভাবনার প্রতিফলন দেখা যায়নি; বরং রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় আসীন শাসকগোষ্ঠী চরম প্রতিক্রিয়ার ধারায় চলতে শুরু করে। বঙ্গবন্ধু, মুক্তিযুদ্ধ ও সদ্যস্বাধীন দেশের আদর্শ, নীতি ও আকাক্সক্ষা কার্যত অবরুদ্ধ হয়ে পড়ে।

সামাজিক-অর্থনৈতিক এমনকি দার্শনিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক ধারায়ও জাতির বিভক্তি দৃশ্যমান হয়। রাষ্ট্রের মদদে ও তৎকালীন বিশ্বব্যবস্থার প্রশ্রয়ে নতুন একটি এলিট শ্রেণির বিকাশ সামাজিক ভারসাম্যকে ক্ষতিগ্রস্ত করে, অপরিকল্পিত নগরায়ণ সার্বিক আর্থসামাজিক কাঠামোকে জটিল করে তোলে। শিক্ষাসেবার মাপকাঠিতে গ্রাম-শহরের মাঝে তারতম্য প্রকট হয়ে ধরা পড়ে। আর এ বৈষম্য ও দুরবস্থার সহজ শিকারে পরিণত হয় প্রধানত শিক্ষা।

দেশের গোটা শিক্ষাব্যবস্থার দুর্বলতা, বিভাজন ও নৈরাজ্য ক্রমশ প্রকট হয়ে উঠলেও গ্রামীণ শিক্ষাকাঠামোর সামগ্রিক বিপন্নতা সামাজিক অসমতাকে ক্রমাগত বাড়িয়ে তুলেছিল। তবে একথা সত্য, সমাজের চেহারা আজ বেশ পাল্টে গেছে। সাধারণ মানুষের সামর্থ্য বেড়েছে। রুচিতে রূপান্তর এসেছে। পরিবর্তন হয়েছে দৃষ্টিভঙ্গিতে। সামাজিক চাহিদারও বদল হয়েছে। পরিবর্তিত এ প্রেক্ষাপটে ২০৩০-র মধ্যে মানসম্পন্ন শিক্ষার অভীষ্ট অর্জনের লক্ষ্যে তরুণ জনগোষ্ঠীকে দক্ষ সম্পদে বদলে ফেলার নতুন চ্যালেঞ্জ প্রাথমিক শিক্ষার গুরুত্বকে সমকালীন ও প্রাসঙ্গিক করে তুলেছে।

লক্ষণীয়, আজকাল ইংরেজি বা বাংলা মিডিয়াম অভিজাত স্কুলই শহুরে নাগরিক সমাজের প্রথম পছন্দ। তাদের সন্তানরা এসব এলিট বিদ্যাপীঠে লেখাপড়ায় স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করে, হয়তো খানিকটা গরিমাও বোধ করে। ছিন্নমূল, অসহায় শিশুদের ঠাঁই হয় সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে; অথবা স্রেফ এ বিদ্যালয়গুলো পরিত্যক্ত থাকে অবহেলায়, অনাদরে। রাজধানী থেকে মফস্বল শহর- সর্বত্রই সরকারি স্কুলের এমন রুগ্নদশা। রাষ্ট্রীয় সম্পদের এমন অপচয়ের চিত্র এ সমাজে এখন বেশ পরিচিত, অনেকটাই গা সওয়া।

উদ্বেগের আরও একটা দিক- সব স্কুল মানসম্পন্ন নয়। শিক্ষক, কারিকুলাম বা পাঠ্যবই- মান যাচাই বা নজরদারির নাগালে আছে কি না জানা নেই। অভিভাবক ঝুঁকছে অনেকটাই অন্ধ আকর্ষণে; সামাজিক স্ট্যাটাস বা প্রদর্শনবাদী মনোভঙ্গির তাড়নায়। ফলে মুনাফাশিকারি ব্যবসায়ীর নজর এখন এ বাজারে। কোচিং-গাইড তো আছেই। তবে গ্রামের চিত্র ভিন্ন। এখানে অপেক্ষাকৃত সচ্ছল কিংবা দরিদ্র- সবার আশ্রয় সরকারি এ প্রতিষ্ঠানগুলোতে।

স্কুলগুলো তাই সেখানে সতেজ, প্রাণবন্ত। সরকারের সদিচ্ছা-প্রণোদনা বা নাগরিকের সামর্থ্য বৃদ্ধি বা জীবনমানে ইতিবাচক পরিবর্তনের কারণেই হোক- দৃষ্টিভঙ্গির পরিসরে শ্রেণি-লিঙ্গ নির্বিশেষে অন্তত শিক্ষাগ্রহণের প্রশ্নে একটা নীরব বিপ্লব ঘটে গেছে। নাগরিক মানসে এ রূপান্তরের সুবিধা নিয়েছে রাষ্ট্র। শিক্ষায় অন্তর্ভুক্তি প্রায় শতভাগ। কন্যাশিশুর অংশগ্রহণ বিস্ময়কর। দেশে-বিদেশে এ সাফল্য শুধু প্রশংসিত নয়, রীতিমতো মডেলে পরিণত হয়েছে।

শিক্ষায় অংশগ্রহণ, সার্বজনীনতা, লিঙ্গসমতা বিশ্বনন্দিত হয়েছে- একথা ঠিক; আবার নতুন চ্যালেঞ্জও এসেছে শিক্ষার গুণগতমান অর্জনের প্রশ্নে। এসডিজি-৪ নির্ধারণ করেছে শিক্ষায় কাঙ্ক্ষিত মান অর্জনের লক্ষ্য। পাসের হার সবসময় শিক্ষার মানের যথার্থ নির্দেশক হতে পারে না। সংখ্যা নয়, গুণই হবে শিক্ষার সমকালীন মাপকাঠি। শিক্ষার মানের অর্থেও এখন বদল এসেছে। গতানুগতিকতার জায়গা নিয়েছে দক্ষতা ও জ্ঞান; অর্থাৎ একজন শিক্ষার্থীকে বর্তমান বিশ্বে টিকে থাকতে হলে তাকে অর্জন করতে হবে যোগাযোগশৈলী, ইংরেজি-বাংলায় স্বাচ্ছন্দ্য, গণিতে পারদর্শিতা ও তথ্যপ্রযুক্তিতে উৎকর্ষ। শিক্ষার্থী হবে কল্পনাপ্রবণ, সৃজনশীল, বিশ্লেষণাত্মক। তার ভূষণ হবে নীতি, আদর্শ ও দেশপ্রেম।

দেশে মোট প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সংখ্যা ১ লাখ ৩৪ হাজার ১৪৭। এর মধ্যে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ৬৫ হাজার ৫৯৩টি। প্রাথমিক শিক্ষায় সর্বমোট ৪ লাখ ৪৯ হাজার ৭৯৯ জন শিক্ষক দুই কোটিরও বেশি শিক্ষার্থীকে শিক্ষাদান করে থাকেন। শিক্ষার মান ও শিক্ষকের যোগ্যতা পরস্পর পরিপূরক। মান নিশ্চিত করেন দক্ষ শিক্ষক। প্রয়োজন পড়ে সঠিক ছাত্র-শিক্ষক অনুপাত। শিক্ষার উপযুক্ত পরিবেশ। শিক্ষা উপকরণ। আধুনিক প্রযুক্তি। আরও গুরুত্বপূর্ণ- সেসব উপকরণ ব্যবহারে সক্ষমতা। সেজন্য চাই প্রশিক্ষণ।

লক্ষ্য রাখতে হবে, প্রশিক্ষণের ফিডব্যাক ইতিবাচক হচ্ছে কিনা। প্রশিক্ষণ খাতে যে বিপুল অর্থ ব্যয় হচ্ছে, তার সুফল উপকারভোগী পাচ্ছে কিনা। এজন্য দরকার তদারকি। দরকার ব্যবস্থার স্বচ্ছতা, গতিশীলতা ও জবাবদিহিতা। মনে হয়, প্রাথমিক শিক্ষক নিয়োগ অতীতের তুলনায় এখন অনেকটা স্বচ্ছ, মানসম্মত। শিক্ষিত ও মেধাবী তরুণ-তরুণীরা সরকারি স্কুলে শিক্ষকতায় আগ্রহ দেখাচ্ছে, এটা নিঃসন্দেহে ভালো লক্ষণ। অভিভাবকের উৎসাহ, রাষ্ট্রের সমর্থন অথবা নাগরিকের সামর্থ্য- যে কারণেই হোক, এনরোলমেন্ট বাড়ছে; নারী-পুরুষ নির্বিশেষে। তবে শিক্ষা প্রশাসনের অলিগলিতে দুর্নীতির ঘোরাফেরা পুরনো ও প্রতিষ্ঠিত।

সামাজিক অগ্রগতির বিদ্যমান বাস্তবতা থেকে সর্বোচ্চ সুবিধা আদায় করার পথে এটাই বড় অন্তরায়। সার্ভিস বুক মূল্যায়ন থেকে শুরু করে শিক্ষকের পদায়ন, বদলি, প্রশিক্ষণ, ছুটি বা প্রেষণ- সব কর্মকাণ্ডকে যদি স্বচ্ছ ব্যবস্থার আওতায় আনা যায়, তার সুফল ভোগ করবে ছাত্রছাত্রীরা। হিসাবরক্ষণ অফিসের বহুল আলোচিত দুর্নীতির চক্রব্যূহ থেকে শিক্ষকের নিস্তার সহজে মেলে না। এসব হয়রানি পরিস্থিতিকে জটিল করে তোলে, শিক্ষক হতাশ হন অথবা অনিবার্য নেক্সাসের কাছে নিজেকে সমর্পণ করেন। ক্ষতিগ্রস্ত হয় বুনিয়াদি শিক্ষা।

প্রতিষ্ঠানগুলোয় শিক্ষকের অপ্রতুলতা মানসম্পন্ন শিক্ষাসেবাকে সার্বজনীন করার পথে বাধা। প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে শিক্ষকের সুষম বণ্টন একটি বড় চ্যালেঞ্জ। বিশেষজ্ঞদের মতে, অন্তত প্রতিটি স্কুলে চারজন শিক্ষক থাকা জরুরি; অথচ বাস্তব ক্ষেত্রে দেখা যায়, কোনো প্রতিষ্ঠানে প্রয়োজনের অতিরিক্ত শিক্ষক রয়েছে, কোথাও নেই। আবার থাকলেও কখনও প্রশিক্ষণ, কখনও প্রেষণে, কখনও বিভিন্ন সরকারি দায়িত্বে নিয়োজিত রয়েছেন। এরপর রয়েছে অনুপস্থিত থাকার প্রবণতা। শিক্ষকের সংখ্যাল্পতা, নিষ্ঠার অভাব এবং উপযুক্ত বিভাগীয় তদারকির অভাবে এ সংকট ঘনীভূত হয়েছে।

পর্যাপ্ত শ্রেণিকক্ষ ও শিক্ষা উপকরণের অভাব মানসম্পন্ন শিক্ষাসেবার পথে বাধা। শ্রেণিকক্ষে ছাত্র-শিক্ষক অনুপাত শিক্ষানুকূল নয়। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, ছাত্র-শিক্ষক অনুপাত ১:৩০ হওয়া উচিত। উপচে পড়া শ্রেণিকক্ষ সামাল দেয়ার দক্ষতা, প্রশিক্ষণ ও প্রণোদনা শিক্ষকের নেই। আধুনিক টিচিং-লার্নিং পদ্ধতির সঙ্গেও শিক্ষকের পরিচয় কম। পিছিয়ে পড়া শিক্ষার্থীর জন্য বিশেষ কৌশল বা যত্নের চর্চা নেই। কোচিং-গাইড-টিউশনের সংস্কৃতি শিক্ষার পরিবেশকে মারাত্মকভাবে কলুষিত করছে। ২০১২ থেকে শুরু করে এ ক্ষতিকর সংস্কৃতির বিরুদ্ধে সরকার নানা পদক্ষেপ গ্রহণ করলেও অসুস্থ এ চর্চা থেকে দেশ আজও মুক্ত হতে পারেনি।

২০১০ সালের শিক্ষানীতি অনুযায়ী, ৮ম শ্রেণি পর্যন্ত প্রাথমিক স্তরকে উন্নীত করা এবং উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষার আগে দুটি পরীক্ষা নেয়ার সিদ্ধান্ত প্রশংসিত হলেও সরকার তা ২০২১ পর্যন্ত বাস্তবায়ন স্থগিত করে। শিক্ষার্থীর বয়স, শিক্ষার পরিবেশ ও মূল্যায়ন পদ্ধতি নিয়ে সাম্প্রতিক সময়ে ব্যাপক আলোচনা হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা প্রায় একমত যে, ভর্তি পরীক্ষা থেকে শুরু করে অন্তত তৃতীয় শ্রেণি পর্যন্ত শিশুদের ওপর অত্যধিক পড়াশোনার চাপ তাদের স্বাভাবিক মনোজাগতিক বিকাশের পথে অন্তরায়।

সরকারের শীর্ষপর্যায়ে বিষয়টি নিয়ে চুলচেরা বিশ্লেষণ হচ্ছে। অনেকে যুক্তি দেখিয়েছেন, বিশ্বের অনেক উন্নত দেশে শিশুরা সাত বছর বয়সে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষাকাঠামোতে প্রবেশ করে। তৃতীয় শ্রেণির নিচে বইয়ের চাপমুক্তি, পরীক্ষার ভার লাঘব নিঃসন্দেহে একটা ভালো ভাবনা। পড়াশোনা বিদ্যালয়েই সীমাবদ্ধ রাখা গেলে ভালো হয়। একাডেমিক পড়াশোনা হবে স্কুলেই। জানা যাচ্ছে, তৃতীয় শ্রেণি পর্যন্ত প্রথাগত পরীক্ষার বদলে বিদ্যালয়ে ধারাবাহিক মূল্যায়ন হবে।

এ লক্ষ্যে হাতেকলমে শেখানো যায়, এমনভাবেই তৈরি হবে পাঠ্যবই। শিক্ষাক্রম পরিমার্জিত করে প্রাক-প্রাথমিক হতে উচ্চমাধ্যমিক পর্যন্ত এমন বই শিক্ষার্থীদের কাছে পৌঁছে যাবে। ২০২৫ নাগাদ কার্যক্রমটি সম্পন্ন হবে বলে বিভিন্ন সূত্রে জানা যায়। পরীক্ষা নিয়ে সিদ্ধান্তের অস্থিরতা কাম্য নয়। গ্রেডের বিষয়েও তাই; অর্থাৎ যথেষ্ট সময় ও মনোযোগ দিয়ে কোনো সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে অবশেষে তা বাস্তবায়ন করা মঙ্গলজনক হবে। কারণ এর ফলে শিক্ষার্থী-অভিভাবক যেমন উদ্বিগ্ন থাকেন, অন্যদিকে কোন সময় কোন গ্রেডের মান কেমন ছিল, ভবিষ্যতে তা যাচাই করাও কঠিন হতে পারে।

শিশুকে শুধু মেধা তালিকায় প্রথম নয়, দায়িত্বশীল নাগরিক হতে দীক্ষা দিতে হবে। প্রতিযোগিতা যেন সুস্থতার গণ্ডি ছাপিয়ে না যায়, সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে। পরীক্ষার ভালো ফলে শিক্ষার্থী স্বীকৃতি পায়; তাতে উদ্দীপনা বাড়ে। শিশুর আস্থা বাড়ে। এ আত্মবিশ্বাস অনেক গুরুত্বপূর্ণ।

একজন শিশুর বুদ্ধিবৃত্তিক উত্তরণ, আবেগীয় বিকাশ, শারীরিক ফিটনেস, আচার-আচরণ, মানসিকতা-সবকিছুই শিক্ষার্থীর সক্ষমতা ও মেধার মানদণ্ড। শিক্ষার্থীর নৈতিক, উদ্ভাবনী, স্বেচ্ছাসেবী ও মানবিক উত্তরণের বুনিয়াদ জীবনের সূচনালগ্নেই শুরু হয়। মানসম্পন্ন শিক্ষা বিস্তারের পথে সামাজিক বৈষম্য একটি বড় বাধা। সমাজের এ অসমতা তরুণ প্রজন্মকে অশোভন, নিু পারিশ্রমিক ও অনিরাপদ কর্মসংস্থানে নিয়োজিত রাখে, যা অর্থনৈতিক অগ্রগতিকে থামিয়ে দেয় এবং বৈষম্য বাড়িয়ে মধ্যম আয়ের দেশে পরিণত হওয়ার স্বপ্নকে দুরস্ত করে।

শিক্ষক সৃজনশীল, আনন্দময় ও মজার কাজের জগতে শিক্ষার্থীকে নিয়ে যেতে পারেন। এমনকি প্রযুক্তি ব্যবহার করেও সুস্থ বিনোদন ও শিক্ষা একসঙ্গেই সম্ভব হতে পারে। মনে রাখতে হবে, আগামী সময়ে শিশুকে এ প্রযুক্তির জগতে সাবলীল ও সুস্থভাবে বিচরণ করতে হবে। তার ব্যক্তিগত, সামাজিক ও পেশাগত নিরাপত্তা তাকেই নিশ্চিত করতে হবে। সুতরাং সে জগতে তার প্রবেশগম্যতা যাতে অনায়াস হয়ে ওঠে, সেজন্য শিক্ষককে দক্ষ ও আধুনিক দৃষ্টিভঙ্গি লালন করতে হবে।

চতুর্থ শিল্পবিপ্লব মোকাবেলায় একটি সুস্থ ও উদ্যমী প্রজন্ম গড়ে তুলতে একটি প্রযুক্তিবান্ধব শিক্ষাঙ্গন দরকার। মাননীয় শিক্ষামন্ত্রীর ভাষায় এ নতুন প্রজন্মই হবে এজেন্ট অব চেইঞ্জ। বিজ্ঞানমনস্ক নতুন এ তারুণ্য মাদক, সন্ত্রাস, জঙ্গিবাদ থেকে দূরে থাকবে, পরিবেশ রক্ষায় সচেতন হবে। বাল্যবিয়ে, যৌতুক ও যৌন হয়রানি প্রতিরোধে তারা ভূমিকা রাখবে।

সমাজের চাহিদা বা রাষ্ট্রের লক্ষ্য কী- এ বিষয়ে প্রথমেই নিষ্পত্তি হওয়া প্রয়োজন। রাষ্ট্রের চরিত্র বা আদর্শ যদি মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় একটি অসাম্প্রদায়িক, আধুনিক ও মানবিক সমাজ গঠন হয়, তবে অবশ্যই ‘পপুলিস্ট মাইন্ডসেট’ থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। বিজ্ঞানমনস্ক মানসকাঠামো তৈরি কিংবা যুক্তিবাদী চিন্তাশৈলী বিকাশের পথ যাতে কোনোভাবেই রুদ্ধ না হয়, সেদিকে খেয়াল রাখা জরুরি। উদ্দেশ্য বা ভাবনায় যদি কোনো অস্পষ্টতা বা বিভ্রান্তি না থাকে, তবে শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যসূচির আধুনিকায়ন অপরিহার্য।

গতানুগতিক শিক্ষার বদলে যাতে শিক্ষার্থী জীবনমুখী ও কর্মমুখী দক্ষতা অর্জনে আগ্রহী হয়, সে লক্ষ্যে সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গিতে পরিবর্তন আনতে হবে। শিক্ষানীতির পথরেখায় দেশের সমাজ, অর্থনীতি, সংস্কৃতি, পরম্পরা, জলবায়ু, ভূ-রাজনীতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে এবং সর্বোপরি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাশাসিত নতুন বিশ্বব্যবস্থায় আমাদের পরবর্তী প্রজন্ম যাতে অভিযোজিত হয়ে সক্ষমতার পরিচয় দিতে পারে, সে লক্ষ্যে প্রাথমিক শিক্ষাকে যুগোপযোগী করার কোনো বিকল্প নেই।

অমিত রায় চৌধুরী : সরকারি কলেজের অধ্যক্ষ

সূত্রঃ যুগান্তর