প্রাথমিক সহকারী শিক্ষকদের ১১তম ও প্রধান শিক্ষকদের ১০ম গ্রেড মুজিববর্ষেই শিক্ষকদের প্রানের দাবী !

‘শিক্ষা যদি জাতির মেরুদণ্ড’ এই চিন্তাকে বাস্তবে রূপ দান করার প্রথম প্রয়াস প্রাথমিক শিক্ষা। প্রাথমিক বিদ্যালয়ে যেসব শিক্ষার্থী ভর্তি হয় তাদের সবার মস্তিষ্ক থাকে সাদা পাতার ন্যায় স্বচ্ছ। এসময় শিক্ষার্থীদের যে প্রক্রিয়ায় গড়ে তোলা হবে, পরবর্তী সময়ে তাদের আচরণে সে প্রক্রিয়ার প্রতিফলন ঘটবে। তাই প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষা যথাযোগ্য না হলে হাইস্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের কোথাও শিক্ষার্থীদের যোগ্য হয়ে গড়ে ওঠা সম্ভব নয়। এজন্যই জাপান, সিংগাপুর ও ফিনল্যান্ডের মতো উন্নত দেশগুলো তাদের দেশের প্রাথমিক শিক্ষাকে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেয়।

সিংগাপুরের নীতিনির্ধারকরা মনে করেন যে, তাদের দেশের একজন শিক্ষার্থী বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত পড়াশুনা করতে সমর্থ নাও হতে পারে; তাই তারা তাদের প্রাথমিক শিক্ষাকে এমনভাবে সাজিয়েছেন যাতে একজন শিক্ষার্থী প্রাথমিক শিক্ষা শেষ করে আর কোনো শিক্ষা গ্রহণ করতে সমর্থ না হলেও সেই শিক্ষার্থী যেন মানবসম্পদে পরিণত হতে পারে।

সাদা পাতার ন্যায় স্বচ্ছ মস্তিষ্কের অধিকারী এই প্রাথমিক শিক্ষার্থীদের শিক্ষা দিতে যারা সবচেয়ে নিরলস পরিশ্রম ও কষ্ট সহ্য করেন তারা হচ্ছেন প্রাথমিকের শিক্ষক। উন্নত দেশগুলোতে প্রাথমিক শিক্ষকদের বেতন মর্যাদা অত্যধিক। এমনকি সেই দেশগুলোতে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের চেয়ে প্রাথমিক শিক্ষকদের বেতন মর্যাদা বেশি। এজন্য উন্নত দেশের সেরা মেধাবীরা প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকতা পেশায় আকৃষ্ট হয়ে যোগদান করেন। অথচ আমাদের দেশে ঠিক তার বিপরীত চিত্র। ঠিক যেন গাছের গোড়ায় পানি না ঢেলে আগায় পানি ঢেলে সুমিষ্ট ফল পাওয়ার মহোউৎসব।

এদেশে মানুষ গড়ার আসল কারিগর প্রাথমিক শিক্ষকদের বেতন-মর্যাদা সবচেয়ে নিম্ন। তাই মেধাবীরা এ পেশায় আকৃষ্ট হয় না। যেসব মেধাবী শিক্ষক এ পেশায় রয়েছেন তারা নিদারুণ অবহেলা ও অপমানিত হয়ে এ পেশা ছাড়তে চেষ্টা করেন অথবা মানসম্মত প্রাথমিক শিক্ষা দেয়ার আগ্রহ হারিয়ে ফেলে নিষ্ক্রিয় হয়ে যান। প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ২ ধরনের শিক্ষক রয়েছেন; প্রধান শিক্ষক ও সহকারী শিক্ষক। উভয় প্রকার শিক্ষকদের নিয়োগে শিক্ষাগত যোগ্যতা স্নাতক। দেশের স্নাতক নিয়োগ যোগ্যতার অধিকাংশ পেশাজীবী ১০ম গ্রেডে বেতন পেলেও প্রাথমিকের প্রধান শিক্ষকরা বেতন পান ১২তম গ্রেডে ও সহকারী শিক্ষকরা বেতন পান ১৫তম গ্রেডে। এমনকি বিসিএস নন-ক্যাডার থেকে নিয়োগকৃত অন্য পেশাজীবীরা সবাই ১০ম গ্রেডে নিয়োগে পেলেও একই সাথে যোগদানকৃত প্রাথমিকের প্রধান শিক্ষকরা যোগদান করেছেন ১২তম গ্রেডে। অন্যদিকে প্রধান শিক্ষকদের সাথে একই শিক্ষাগত যোগ্যতায় (স্নাতক) নিয়োগ পাওয়া সত্বেও এবং পদ অনুসারে প্রধান শিক্ষকদের ১ ধাপ নিচে সহকারী শিক্ষকদের বেতন নির্ধারণ হওয়ার কথা হলেও সহকারী শিক্ষকরা বেতন পাচ্ছেন ১৫তম গ্রেডে। যোগদান করে প্রাথমিক শিক্ষায় ডিপ্লোমা ডিগ্রি অর্জন করে প্রাথমিকের প্রধান শিক্ষকরা বেতন পান ১১তম গ্রেডে ও সহকারী শিক্ষকরা বেতন পান ১৪তম গ্রেডে। অথচ এসএসসি অথবা এইচএসসি পাসের পর ডিপ্লোমা করে অথবা ট্রেড কোর্স করে অধিকাংশ অন্য পেশাজীবীরা ১০ম অথবা ১১তম গ্রেডে বেতন পাচ্ছেন।

প্রাথমিকের প্রধান শিক্ষকরা ১০ম গ্রেড ও সহকারী শিক্ষকরা তাদের নায্য দাবি ১১তম গ্রেডের জন্য দীর্ঘদিন ধরে আন্দোলন করলেও, এমনকি দাবি পূরণে সরকার নির্বাচনী ইশতেহারে প্রতিশ্রুতি দিলেও প্রাথমিক শিক্ষকরা এখনো তাদের কাঙ্ক্ষিত গ্রেডের নাগাল পায়নি। নায্য বেতন মর্যাদা থেকে বঞ্চিত হয়ে প্রাথমিক শিক্ষকরা প্রতিনিয়ত অন্য পেশাজীবীদের কাছে ছোট হচ্ছেন যার প্রভাব পড়ছে শ্রেণিকক্ষে। ফলে জাতির শ্রেষ্ঠ সম্পদ কোমলমতি প্রাথমিক শিক্ষার্থীদের মানসম্মত প্রাথমিক শিক্ষা নিশ্চিত হচ্ছে না। শিক্ষকদের বেতন-মর্যাদা বৃদ্ধি করে আজ পর্যন্ত কোনো জাতি দেউলিয়া হয়ে যায়নি, বরং উন্নতির চরম শিখরে পৌঁছে গিয়েছে। তাই সরকারের কাছে বিনীত অনুরোধ এই মুজিববর্ষে সহকারী শিক্ষকদের ১১তম গ্রেড ও প্রধান শিক্ষকদের ১০ম গ্রেড প্রদান করে প্রাথমিক শিক্ষকদের আর্থ-সামাজিক মর্যাদা বৃদ্ধি করুন।

লেখক : মাহফিজুর রহমান মামুন, সহকারী শিক্ষক, ভীমদামাল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, পঞ্চগড়।