দেশের শিক্ষাব্যবস্থা

একটি শিশুর কাছাকাছি বড় কেউ এলে প্রশ্ন করেন বড় হয়ে কী হতে চাও? স্কুলে কেউ পরিদর্শনে এলে শিশুদের কাছে জিজ্ঞাসা থাকে, বড় হয়ে কে কী হতে চাও? শিশুরা উত্তর দেয়, কেউ ডাক্তার হতে চায়, কেউ প্রকৌশলী হতে চায়, কেউ পুলিশ হতে চায়।

এ উত্তরগুলো তারা দেয়, কারণ তাদের অভিভাবকরা চান তারা ভবিষ্যতে এটাই হোক। তারা তাদের অভিভাবকদের স্বপ্নের কথা বলে, নিজেদেরটা বলে না। ভয়ে, লজ্জায় বলে না। কারণ সে যদি বলে আমি ওসব কিছু হতে চাই না, আমি বড় হয়ে নৌকার মাঝি হব, আমি জাহাজের নাবিক হয়ে সমুদ্র দেখতে যাব, তবে সবাই তাকে পচা বলবে।

সে কখনই বলবে না, তার কেবল গাছ দেখতে ইচ্ছে করে। কেউ বলবে না শীতের রাতে যারা রাস্তায় শীতে কাঁপতে কাঁপতে ঘুমোতে পারে না, তাদের ঘুমের ব্যবস্থা করে দেবে। কিন্তু এসব কোমল অনুভূতি শিশুদেরই থাকে। আমার ছেলে বলেছিল সে বড় হয়ে লাঠিওয়ালা আনসার হবে। কারণ ওদের হাতে লাঠি থাকে। লাঠি দিয়ে কী করবে সে? সে যারা মারামারি করে তাদের ওই লাঠি দিয়ে মারবে। কী অদ্ভুত তাই না! আচ্ছা বড়রা যদি শিশুদের কাছে জানতে চাইত, বাবু! তুমি কটা গাছ লাগিয়েছ? তুমি কি কাউকে তোমার অতিরিক্ত শীতের কাপড়টা দিয়েছ? কেউ না খেয়ে থাকলে, তোমার কি কষ্ট হয়?

তোমার কি আকাশ দেখতে ভালো লাগে? তুমি কি ফুল আঁকতে পছন্দ করো? আশ্চর্যজনক হলেও সত্যি এসব প্রশ্ন কেউ করে না। বরং আমরা কেবল একটাই প্রশ্ন করি, বড় হয়ে কী হতে চাও? আরো আশ্চর্যজনক ব্যাপার হলো এই প্রশ্নে উত্তরটাও আমাদের প্রত্যাশা পূরণ করতে হবে। তা না হলে শিশুটির বড় হওয়া মানে বড় হওয়া হবে না। আমার কাছে মনে হয়, আমরা এভাবে শিশুদের মাল্টিপল চয়েস কোশ্চেনের মতো উত্তর দেওয়ার স্বাধীনতাকে ছকে বেঁধে দিচ্ছি।

এভাবে আমরা কোমলমতি শিশু মনের অস্ফুটিত স্বপ্নগুলো, কোমল হৃদয়ের অনুভূতিগুলো আমরাই অঙ্কুরে মেরে ফেলছি। এভাবে আমরা শিশুদের সুকুমার প্রবৃত্তিকে কঠিন থেকে কঠিন করে তুলছি। এ যুগের অভিভাবকরা তাদের স্বপ্নগুলো পূরণে শিশুকে অনেকটাই বাধ্য করছি। এ কালের শিশুদের নেই শৈশবের দুরন্তপনার সুযোগ, নেই কৈশোরের ডানপিটে ওয়ার সুযোগ। পড়া পড়া আর পড়া এমন কড়া শাসনে অতিষ্ঠ শৈশব, কৈশোর।

তাদের নিজস্ব সত্তার বিকাশ হবে কীভাবে। আমরা বুঝতে চাই না কেন যে, এই শিশুদের মধ্য থেকেই কেউ নায়ক হবে, কেউ গায়ক হবে, কেউ হবে আদর্শ খামারি, কেউ হবে চিত্রশিল্পী। আবার কেউবা হবে ক্রিকেটার, কেউ হবে রন্ধনশিল্পী, কেউ লেখক-কবি বা ছড়াকার। কেউ তো রাজনীতিবিদও হবে। কেউ রেলের টিকিট চেকার হবে, কেউ হবে গবেষক, কেউবা হবে বাউলশিল্পী। এসব কিছুই কেউ না কেউ হবে। তবে আমরা কেন শুধু নির্দিষ্ট কিছু একটা হতে বলছি। অথবা কেনইবা তাদের নির্দিষ্ট ছকে বেঁধে দিচ্ছি। দুঃখ লাগে বাবা-মা অনেক সময় নিজের জীবনের অপূর্ণ স্বপ্নগুলো চাপিয়ে দেন শিশুর ওপর। অনেক বাবা-মা শিশুকে ডাক্তার ইঞ্জিনিয়ার বা প্রশাসনের কেউকেটা বানানোকে নিজেদের সামাজিক মর্যাদা বৃদ্ধির অন্যতম উপায় মনে করেন।

অনেকে চান তাদের সন্তান বড় হয়ে টাকার কুমির হোক, কাঁড়ি কাঁড়ি টাকা রুজি করুক। সেজন্য মরিয়া হয়ে বৈধ-অবৈধ খুঁজি না আমরা। ফলে সেই সন্তান এক দিন ডাক্তার হয়ে টাকা রুজির পথ খুঁজে নেয়। বৈধতা-অবৈধতার ধার খুঁজে না। একই রকম অন্যান্য পেশার ক্ষেত্রেও। যার প্রতিফলন আজ আমরা দেখতে পাচ্ছি। অত্যন্ত জটিল পরিস্থিতিতেও মানুষ অসৎ পথে টাকা রোজগারে পিছপা হচ্ছে না। বাবা-মা সন্তান জন্ম দেন, সন্তান পালন করেন, খেতে পড়তে দেন। তাদের নিরাপত্তাও নিশ্চিত করেন। ইংরেজিতে পালন অর্থ bringing up, তো কথা হচ্ছে- গরুও তো মানুষ পালে। হাঁসমুরগিও পালে। তাহলে এর সঙ্গে সন্তান পালনের কী পার্থক্য রইল! আমরা সন্তান বড় করছি, লেখাপড়া শিখাচ্ছি, বড় হয়ে সে টাকা রুজি করবে, মস্ত বাড়ি করবে, গাড়ি করবে; এই হলো আমাদের চিন্তাধারা।

ইংরেজদের চাপিয়ে দেওয়া এই শিক্ষাব্যবস্থায় এই হলো শিক্ষার শেষ হাল। ইউরোপীয় education হলো করে খাওয়া। এই করে খাওয়ায় করা বিষয়টি আজ নারকীয় রূপ ধারণ করেছে। খাবারে বিষ, নকল ওষুধ, নির্মাণে ভেজাল মোটকথা সব বিষয়ে আজ দুর্নীতির প্রকোপ মূলত আমাদের বুনিয়াদি নৈতিক শিক্ষার অভাবের ফল। আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা আর অভিভাবকদের প্রত্যাশা সন্তানদের মনে বোধের জাগরণ ঘটাতে পারছে না।

আমরা জানি, শিক্ষার সঙ্গে দীক্ষার একটি সম্পর্ক আছে। আমরা দীক্ষা ফেলে দিয়ে কেবল শিক্ষা নিয়ে আছি। পালনের সঙ্গে লালনের একটি সম্পর্ক আছে। আমরা লালন ফেলে দিয়ে পালন নিয়ে আছি। অথচ এগুলো পৃথক শব্দ হলেও পরিপূরক এবং জীবনের জন্য তাৎপর্যপূর্ণ তো বটেই। ইংরেজি অনুসরণ করতে গিয়ে আমরা দুটোর একটিকে হয় বাদ দিয়েছি, নয় এক করে নিয়েছি। শব্দ বাদ দিলে চিন্তার জগৎ ছোট হয়ে যায়।

কাজেই আমাদের শিক্ষা-দীক্ষা, লালন-পালন সম্পর্কিত ধ্যানধারণাও পাল্টে গেছে। লালন করা হলো, কাউকে তার কাক্সিক্ষত দিকে যেতে দেওয়ার বিষয়ে সহযোগিতা করা। এতে সে বহির্মুখী হয়, তার চিন্তার জগৎ বিস্তৃত হয়। পালন করা হলো অন্তর্মুখী বিষয়। যেমন তার খাওয়ানো, পরানো, বাহ্যিকভাবে বড় হতে সাহায্য করা, তার ইচ্ছাকে দমন করা। বরং নিজের ইচ্ছাকে তার মাধ্যমে হাসিল করাই পালনের গন্তব্যসীমা।

​লেখক- রুবি বিনতে মনোয়ার