মানসম্মত শিক্ষা বাস্তবায়নে পোষ্য কোটা

শিক্ষক সংকটে জর্জরিত প্রাথমিক শিক্ষা। এ সংকট অনেকটা বড় ট্রাকের পেট্রোলের পাত্রে ‘জন্ম থেকে জ্বলছি’ লেখার মতো। মানসম্মত প্রাথমিক শিক্ষা বাস্তবায়নে পেশাগত দায়িত্ব পালনে নিবেদিত শিক্ষক প্রয়োজন। সভ্যতার ভিত্তি শিক্ষা। এটি সাধনার বিষয়। শিক্ষা আর শিক্ষাদান এক নয়। শিক্ষকতা একইসঙ্গে পেশা ও ব্রত।

পেশা অর্থ ঠিক জীবিকা নয়, পেশাদারিত্ব। অর্থাৎ মনপ্রাণ, সাধ্য, সামর্থ্য উজাড় করে লক্ষ্য অর্জনের চেষ্টা। মানুষ তার শিক্ষাজীবনের সবচেয়ে মৌলিক আর গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষাটি অর্জন করে থাকে বাবা-মা ও প্রাথমিক শিক্ষকদের কাছ থেকে।

প্রাথমিক শিক্ষক শিক্ষা, জ্ঞান, নৈতিকতা, মূল্যবোধের শিক্ষা দিয়ে থাকেন। শিক্ষকের চাল-চলন, আচার-ব্যবহার নিয়ে শিশু শিক্ষার্থীরা বিকশিত হয়। ১৯৮৪ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি প্রাথমিক শিক্ষকদের জন্য ছিল একটি শুভদিন। আগের দিন রাতে ঢাকা শহরে মুষলধারে বৃষ্টি হয়েছিল।

সেদিন ঢাকা ওসমানী উদ্যানে হয়েছিল বাংলাদেশ প্রাথমিক শিক্ষক সমিতির মহাসম্মেলন। বিশাল উদ্যানে ছিল বৃষ্টির কাদা-পানি। লক্ষাধিক শিক্ষকে ভরে গিয়েছিল ওসমানী উদ্যান।

প্রধান অতিথি রাষ্ট্রপতি এরশাদ কাদা-পানির মধ্যে এত শিক্ষকের উপস্থিতি দেখে অভিভূত হয়ে পড়েন। তিনি আবেগময় কণ্ঠে বলেন, আপনাদের সভাপতি অধ্যাপক আযাদ আমাকে চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিলেন সমাবেশ আর মহাসমাবেশ কাকে বলে।

সভাপতির বক্তব্যে অধ্যাপক আযাদ প্রাথমিক শিক্ষকদের পোষ্য কোটার গুরুত্ব তুলে ধরেন। তিনি বলেন, পেশাজীবীদের মধ্যে একমাত্র সৎ, চরিত্রবান হলেন প্রাথমিক শিক্ষকরা। তারা শুধু আগামী প্রজন্মের শিশুদের মানুষ গড়ার কারিগর নন, সমাজ গড়ারও কাজে আত্মনিয়োগ করে থাকেন।

গ্রামে ধনী, দরিদ্র অধিকাংশ মানুষ শিক্ষকের পরামর্শ নিয়ে তাদের বিভিন্ন কাজ করে থাকে। প্রাথমিক শিক্ষকদের সাহচর্যে থেকে অভিজ্ঞতা অর্জন ও পেশার প্রতি শ্রদ্ধা একমাত্র প্রাথমিক শিক্ষকদের পরিবারের রক্তে বিদ্যমান থাকে।

এ দৃষ্টিকোণ থেকে প্রাথমিক শিক্ষকদের সন্তানদের পোষ্যের কোটা ২০ শতাংশ থেকে বৃদ্ধি করা প্রয়োজন। প্রাথমিকে পোষ্য কোটার সঙ্গে অন্যান্য কোটার বৈশিষ্ট্য আলাদা। এ কোটা বহাল থাকলে প্রাথমিক শিক্ষকদের সন্তানরা প্রাথমিক শিক্ষার প্রতি আন্তরিক হয়ে কাজ করবে। ফলে মানসম্মত প্রাথমিক শিক্ষা দ্রুত বাস্তবায়ন হবে।

প্রাথমিকে লিখিত পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ার পরও পোষ্য কোটা যথাযথ পূরণ হচ্ছে না। ২০১৪ সালের পর প্রাথমিক শিক্ষক নিয়োগ ২০১৮ সালে অনুষ্ঠিত হয়। মৌখিক পরীক্ষায় নানা কারসাজিতে লিখিত পরীক্ষায় পোষ্য কোটায় উত্তীর্ণদের বাদ দিয়ে সাধারণ কোটা থেকে শিক্ষক নিয়োগ দেয়া হতাশাব্যঞ্জক ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত।

শিক্ষক নিয়োগে দীর্ঘ সময়ক্ষেপণের কারণে যাদের প্রাথমিক শিক্ষক হওয়ার স্বপ্ন ছিল, বয়স না থাকায় বর্তমান নিয়োগ পরীক্ষায় তাদের অংশগ্রহণের সুযোগ নেয়া অযৌক্তিক। কারণ সংশ্লিষ্টদের সময়ক্ষেপণের কারণে তাদের শিক্ষক হওয়ার স্বপ্ন বাস্তবায়িত হয়নি।

পুল নীতিমালা-২০১৪-এর রিট জটিলতার কারণে দীর্ঘ চার বছর নিয়োগ বন্ধ ছিল। এ কারণে অনেকেরই বয়স বেড়ে গেছে। এ জন্য তারা কোনোভাবে দায়ী ছিলেন না। তাছাড়া সেশনজটের কারণে চার বছরের কোর্স শেষ হতে তাদের ছয় থেকে সাত বছর লেগে গেছে। তারা একটি মাত্র নিয়োগ পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করার সুযোগ পেয়েছেন।

প্রাথমিকের শিক্ষক হওয়ার স্বপ্নে যারা বিভোর, তাদের বয়সের বিষয়টি বিবেচনা করে হলেও তাদের শিক্ষক হওয়ার স্বপ্ন পূরণ করা হোক। শিক্ষক সংকট বজায় রেখে পোষ্য কোটা বাদ দিয়ে মানসম্মত প্রাথমিক শিক্ষা বাস্তবায়নের স্বপ্ন অবাস্তব। বিষয়টির প্রতি মাননীয় প্রধানমন্ত্রীসহ সংশ্লিষ্টদের সুদৃষ্টি কামনা করছি।

মো. সিদ্দিকুর রহমান : সভাপতি, বঙ্গবন্ধু প্রাথমিক শিক্ষা গবেষণা পরিষদ

সুত্রঃ যুগান্তর