লোভ, কথার বিষ আর স্বার্থের মায়াজালে সম্পর্ক গুলো এভাবেই ভেঙ্গে যায়

বিশ্ব জোড়া পাঠশালা মোর, সবার আমি ছাত্র। এই বাক্যটি চিরন্তন সত্য। কয়েকদিন আগে অটোর পেছনের সীটে একা বসে আছি। সামনে ড্রাইভার ও তার পাশে একযাত্রীর আলাপচারিতা কানে আসছে। মূলত অটোচালকই কথা বলছে। অটোচালকের বয়স পঞ্চাশ ছুঁই ছুঁই। লোকটি বলছে, তারা দুই ভাই, মা বেঁচে আছে। যৌথ পরিবার। ছোট ভাই রাজমিস্ত্রীর কাজ করে। কয়েক মাস আগে বিয়ে করেছে।

সংসারে সকল হাটবাজার করতো বড়ভাই আর চাউলের যোগানের দায়িত্ব ছিলো ছোট ভাইয়ের। বড় ভাইয়ের বউ রান্নাবান্না করতো। তাদের একটি মেয়ে ছিলো। তার বিয়ে হয়ে গেছে। হঠাৎ করোনায়, দেশজুড়ে লকডাউনের সময় অটো চালানো বন্ধ হয়ে যায়। আয় নেই বললেই চলে। জমানো অল্প কিছু টাকা ছিলো, তা দিয়ে কিছু আলু, ডাল কিনে নিয়ে যায় লোকটি। ছোট ভাইয়ের কাজ ঠিকই চলছিল।

সে চাউল নিয়ে আসে কিন্তু ভাতের সাথে ভালো তরকারি না পেয়ে সে মেজাজ দেখিয়ে চলে যায়। এভাবে দুএক দিন যাওয়ার পর, ছোট ভাই কিছু আটা কিনে নিয়ে আসে। এবং তার মাকে বলে,সকালে যেন তিন জনের ভাত রান্না করে। আর বড়ভাই ও তার ভাবি যেন একটা করে রুটি বানিয়ে খায়। পরদিন, তার মা চাল ও আটা এনে ছেলের কথামতো বড় বউকে সবকিছু বুঝিয়ে দেয়। অটোচালক বাড়ি এসে দেখে, তার বউ কাঁদছে আর ছোট ছোট দুটি রুটি বানাচ্ছে। বউকে অনেকবার জিজ্ঞেসা করার পর তার বউ সবকিছু খুলে বলে। তখন, অটোচালক তার মার কাছে গিয়ে ঘটনা সত্য কিনা জানতে চায়। তখন মা বলে, সবই সত্য। সে তার ছোট ছেলের সাথেই থাকবে।

আর তাদের সাথে থাকলে তোকে রুটিই খেতে হবে। এ কথা শুনে, লোকটি তার মাকে বলে, মা তুমি বড়ই ভুল করলা। কাল থেকে দেখবে, তোমাকে দিয়েই সব কাজ করাবে, রান্না করাবে। তুমি ইচ্ছে করলে তাকে ধমক দিতে পারতা, তা না করে সায় দিলা। তোমার লোভের কারণেই আজ তুমি সন্তান হারালা, এ কথা বলে সে চলে যায়। তার বউকে গিয়ে বলে, রান্নাবান্না বন্ধ করো। ধার করে চাল নিয়ে আসে। একাধারে পনেরেদিন লবন, মরিচ দিয়ে ভাত খায়। তবুও মা একদিনও এসে খোঁজ নেয়নি। এখন তারা আলাদাই আছে, বেশ ভালো ভাবেই আছে। সারাদিন অটো চালায়। আয়ও বেশ ভালো।

আর তার মা ঠিকই ছোট ভাইয়ের সাথে রান্নাবান্না করে খায়। লোকটির সকল কথা আমি বিশ্বাস করি নি। কারণ হচ্ছে কোন মানুষ যখন নিজের সম্পর্কে কোন ঘটনার বর্ণনা করে, তখন সে নিজের পক্ষে নানা ধরনের যুক্তি দাঁড় করায়। একে সমাজবিজ্ঞানের ভাষায় ডেরিভেশন বলে। আমার গন্তব্য চলে আসায় আমি অটো থেকে নেমে পরি। রাতে বিষয়টা নিয়ে চিন্তা করে দেখি, ঠিকই সমাজ বদলে গেছে, সম্পর্কও পাল্টে গেছে। এখন, কিছুকিছু মা-বাবার চোখেও সকল সন্তান সমান নয়। যার অর্থ আছে, যার ক্ষমতা আছে তার দিকেই হেলে থাকে। যার মাথায় তেল আছে তার মাথায়ই তেল দিতে চান উনারা। সকল সম্পর্কের মধ্যেই স্বার্থ ডুকে গেছে। বর্তমান মুক্তবাজার অর্থনীতির যুগে টাকাই সকল সম্পর্কের মূল ভিত্তি হয়ে দাঁড়িয়েছে।

যে ভাই সবল সে চাচ্ছে, অন্যরা যেন তার মুখাপেক্ষী হয়ে থাকে, তোষামোদ করে চলে। মায়েরাও সায় দিচ্ছে, সকলে যেন ঐ সন্তানের প্রতি নত হয়ে থাকুক। সে ভলো নাকি মন্দ সেটা এখন মুখ্য নয়, মুখ্য হচ্ছে, কার নিকট অর্থ বেশি আছে। নোংরা কথা, বাজে ব্যবহার দিয়ে অন্যদের মন টুকরো টুকরো করে দিতেও দ্বিধাবোধ করে না। মানুষের মন একবার উঠে গেলে, সেটা আর কখনো স্বাভাবিক হয় না। মনের বাহিরে গিয়ে সে কিছুই করতে পারে না। কিন্তু, এরকমটা হওয়ার কথা ছিলো না।

হাতের পাঁচটা আঙ্গুল সমান নয়, কিন্তু হাতের নিকট সকলের গুরুত্বই সমান। ঠিক তেমনি বাবা-মারও উচিত সকল সন্তানকে সমান দৃষ্টিতে দেখা। অর্থ, অহংকার, ক্ষমতা এগুলো ক্ষনিকের,কিন্তু মানুষের ভালো কর্ম, পূর্বের আচরণ এগুলো চিরস্থায়ী। ঐদিনের অটোচালকের শেষ কথাটা এখনোও কানে বাজে, "মন হচ্ছে কাঁচের মত, যা এক বার ভেঙে গেলে আর জোড়া লাগানো যায় না।" এখনো সময় আছে, সকলকেই দ্রুত নিজেদের বদলাতে হবে। আমি বিশ্বাস করি, সম্পর্ক ও দায়িত্ব কখনো অর্থ ও স্বার্থের কাছে বিক্রি হতে পারে না। আল্লাহ সকলের মঙ্গল করুন। লেখক : মোঃ সাইফুল হক খান সাদী

অনার্স,মাস্টার্স সমাজবিজ্ঞান।