জীবন থেকে শিক্ষা নেওয়া

জীবন থেকে শিক্ষা নেওয়া।

১। হাতে রাখার ফল সবসময় ভালো হয় না।

২। অতি আত্নবিশ্বাসী ভালো না।

৩। ঝুঁকি না নিলে সফলতা আসে না।

গল্পটা একটি গ্রামের অতি সাধারণ ছেলেকে নিয়ে। সে যৌথ পরিবারে বাস করে। পরিবারটি শিক্ষিত। বাবা চাচা সকলেই সরকারী বড় চাকুরে। ছোটবেলা থেকেই ছেলেটার স্বপ্ন, সেও লেখাপড়া শেষ করে একটা ভালো চাকুরী নিবে।

ছোটকাল হতেই সে দাবা খেলাটা খুব ভালো বুঝতো। দাবা খেলাটা মূলত দুটি কৌশলে খেলা হয়। আক্রমণ এবং আত্নরক্ষা। ছেলেটি আত্মরক্ষা নীতিতে খেলতো। নিজেকে সুরক্ষিত করে বা হাতে রেখে আক্রমণ করতো। এভাবেই তার মধ্যে হাতে রাখার প্রবণতা শুরু হয়।

দিনে দিনে ছেলেটা বড় হচ্ছে। এস এস সি তে মানবিক থেকে প্রথম বিভাগে পাশ করে কলেজে ভর্তি হয়। কিন্তু সে কলেজে তেমন একটা যেত না। কলেজ লাইব্রেরী থেকে উপন্যাসের বই নিয়ে আসতো আর বাড়িতে বসে সেগুলো পড়তো। ইন্টারমিডিয়েট অল্প সময়। পরীক্ষার রুটিন এসে গেছে। ছেলেটি নিজেকে জাগিয়ে নিয়ে পরীক্ষায় বসলো।

পরীক্ষার ফল প্রকাশ হল। সে মানবিক থেকে প্রথম বিভাগে পাশ করলো। সে বছর সারাদেশে ফল বিপর্যয় ঘটে। পাশের হার ছিল মাত্র একুশ ভাগ। সবকিছু পরিকল্পনা মতোই হচ্ছিল। এবার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির পালা। কিন্তু বাধা হয়ে দাড়ালো অতি আত্নবিশ্বাস। ছেলেটি ভাবলো, অল্প কয়েকজন পাশ করেছে সে সহজেই টিকে যাবে।

তাই একটি ইউনিট থেকে একটি ফর্মই তুলে ছিল। কিন্তু ছিলো না কোন কোচিং এমনকি কোন গাইডবই। ফলাফল যা হবার তাই হলো অপেক্ষামান। জীবনের সবচেয়ে বড় ধাক্কাটা পেল ছেলেটি। বুঝতে পারলো স্বপ্ন আর বাস্তবতা এক নয়। ছেলেটা কেমন যেন ভীতু হয়ে গিয়েছিল। অনেকটা এলোমেলো হয়ে গিয়েছিলো।

মাথার ভেতরটা ফাঁকা ফাঁকা লাগছিলো। স্থানীয় কলেজ থেকে ছেলেটি অনার্স পাশ করে। ছেলেটি ভাবলো ভালো ভাবে প্রস্তুতি নিয়ে ভালো একটি চাকুরী পেলেইতো সব ঠিক হয়ে যাবে। সে ভাবলো ঢাকা যাবে, কোচিংএ ভর্তি হয়ে নিজেকে মেরামত করবে। সে এক বছরেই কম্পিউটার প্রশিক্ষণ, যুবউন্নয়ন প্রশিক্ষন, শিক্ষক নিবন্ধন, প্রভাষক নিবন্ধন সম্পন্ন করে সার্টিফিকেট হাতে রাখে। ঢাকার একটি কলেজে আইনে ভর্তি হয়।

পাশাপাশি মাস্টার্স অধ্যায়ন চলে। হঠাৎ ছেলেটি একটি ১২তম গ্রেডের সরকারি চাকুরী পেয়ে যায়। থেমে যায় আইন পড়া, কোচিং করা কারণ সেতো ভীতু। চাকুরীটা সে হাতে রাখে। কিন্তু মন বসে না। মাস্টার্স পড়া চলছে, চাকুরী চলছে, মাস শেষে বেতন পাচ্ছে। সংসারের কিছু দায়িত্ব ও কাঁধে পড়েছে। আবেদন, ইন্টারভিউ, চলছে কিন্তু প্রস্তুতি তেমন ভাবে চলছে না। বয়স বাড়ছে, দুশ্চিন্তা বাড়ছে, কিছুই তো হচ্ছে না।

ছেলেটা ভাইবাবোর্ড থেকে ফিরে আসছে। আসবে না কেন তার তো কোন কোটা নেই। সে ভাবলো কোটা নিতে হবে,বয়স হাতে রাখতে হবে। সে এমন একটি চাকুরীতে জয়েন করলো, যেখানে বয়স ৪৫ এবং ৫০ ভাগ বিভাগীয় কোটা ছিলো। নিজেকে সে বোতল বন্দি করে ফেললো। হাতে বয়স থাকলেও তার মধ্যে থেকে হারিয়ে গেছে স্পৃহা, চেষ্টা, উদ্যম আর সাহস। যে ছেলেটার স্বপ্ন ছিলো আকাশ জয়ের সে এখন আলিফ-লায়লার বোতলের জিনের মতোই বন্দী।

ছেলেটি জীবনে অসফল, কারণ সে ঝুঁকি নিতে শিখেনি, সে ছিল রক্ষনাত্বক, সে হাতে রাখতে শিখেছিলো। সে ছিল অতি আত্নবিশ্বাসী। ছেলেটি এখন নিজেই নিজের কাছে লজ্জিত, ঘৃণিত,অপমানিত। একটা অপরাধবোধ সব সময় তাকে তাড়া করে বেড়ায়। সে এখন আর নিজে স্বপ্ন দেখে না,অন্যকে স্বপ্ন দেখায়। জীবনের সবচেয়ে বড় শিক্ষা হচ্ছে, নিজের জীবনে এই শিক্ষা কাজে লাগানো যায় না। সময় কখনো ফিরিয়ে আনা যায় না।

এই পোস্টটি লেখার উদ্দেশ্যে হচ্ছে, আপনারা আপনাদের সন্তাদেরকে ঝুঁকি নিতে শেখাবেন, সাহসী হতে শিখাবেন,তাদের কে বলবেন, সামর্থ্যর চেয়ে বেশি যেন প্রচেষ্টা থাকে। আর হাতে রাখার ক্ষেত্রে যেন সতর্ক থাকে। শেষ অব্দি তাদের পাশে থাকবেন।

তাদের নেওয়া দশটি সিদ্ধান্তের মধ্যে আটটিই ভুল হতে পারে, কারণ তারা অনভিজ্ঞ । কিন্তু আপনার ক্ষেত্রে এই ঝুঁকি কম,কারণ আপনি অভিজ্ঞ। মনে রাখবেন,পিতামাতার সবচেয়ে বড় বিজয় হচ্ছে, সফলতায় সন্তানের কাছে হেরে যাওয়া। তরুনদেরকে বলবো,জীবনে যত বাধা,সমস্যাই আসুক তাদেরকে পিঠ না দেখিয়ে মুখ দেখাবে। আল্লাহ সবাই কে সফলতা দান করুন।

 লেখক : মোঃ সাইফুল হক খান সাদী।

অনার্স,মাস্টার্স সমাজবিজ্ঞান