প্রাথমিক শিক্ষকদের ১৩তম গ্রেড নিয়ে টাল-বাহানা

প্রাথমিক সহকারী শিক্ষকদের ১৩তম গ্রেড প্রাপ্তি এখন হুমকির মুখে। দীর্ঘ আন্দোলন ও দফায় দফায় আলোচনার পর ১১তম গ্রেডের দাবির পরিবর্তে সহকারী শিক্ষকদের ‘১৩তম গ্রেড দিয়ে পরিপত্র জারি করে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়।’ নিম্নধাপে বেতন কমে যায় এমন দাবির ন্যায্যতা উপস্থাপন করলে উচ্চধাপে বেতন নির্ধারণের নির্দেশ দিয়ে আবারো পরিপত্র জারি করা হয়।’

তারপর আলোচনায় আসে, ‘১৩তম গ্রেড সব শিক্ষক পাবেন কি না?’ ২০১৯ সালের সংশোধিত নিয়োগবিধিতে নারী পুরুষ উভয়ের জন্য ন্যূনতম যোগ্যতা স্নাতক দ্বিতীয় শ্রেণি করা হয়। ১৩তম গ্রেডে বেতন বিল করানোর জন্য যখন অর্থ বিভাগ ও মহা হিসাব নিয়ন্ত্রণ বিভাগের কর্মকর্তাদের সাথে শিক্ষক নেতারা যোগাযোগ শুরু করলেন তখন দেখা গেল কেউ কেউ বলছেন, সকল শিক্ষক ১৩তম গ্রেড পাবেন না।

সমস্যাটা শুরু এখানেই। ফেইসবুকে ঝড় উঠলো সবাই যাতে ১৩তম গ্রেডের সুবিধা পান। পক্ষে বিপক্ষে নানা যুক্তি তুলে ধরে লেখালেখি হলো। অবশেষে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের তৎকালীন সিনিয়র সচিব মহোদয়, ‘অর্থবিভাগকে একটি আবেদন পাঠালেন যাতে সকল সহকারী শিক্ষক ১৩তম গ্রেড পান।’

যার উত্তর আজও অর্থবিভাগ দেয় নি। প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের দেয়া নানা কাজের ভীড়ে হারিয়ে গেল ১৩তম গ্রেড প্রাপ্তির বিষয়টি। মাঝে মাঝে সাধারণ শিক্ষকরা মনে করিয়ে দিয়ে ১৩তম গ্রেড প্রাপ্তির বার্ষিক উদযাপন করার কথা বলে হাস্যকর পোস্টও দিয়েছেন।

হঠাৎই গতকাল জয়পুরহাট জেলার ক্ষেতলাল উপজেলার একজন কর্মদক্ষ শিক্ষক ‘মুহাম্মদ মাহবুবর’ রহমানের পোস্টে সবার মাঝে আবার হইচই পড়ে যায়। তিনি জানান, "আইবাস প্লাস প্লাসে শুধু বোতামে টিপ দেয়ার অপেক্ষায় ১৩তম গ্রেড।’

স্নাতক দ্বিতীয় শ্রেণি ছাড়া অন্যরা পাচ্ছেন না ১৩তম গ্রেড।‘ ভাবা যায়! প্রাথমিকের অধিকাংশ শিক্ষকই তো হলো, এইচ. এস. সি. পাশ। আর শিক্ষক নিয়োগের সময় যেখানে নারীদের এস. এস. সি. সমান পুরুষদের স্নাতক নিয়োগ দেয়া হয়েছে তাহলে আজ কেন নয়?

আন্দোলন আর আলোচনার টেবিলে ১১তম গ্রেড দেয়ার অন্যতম বাঁধা হিসেবে দেখানো হয়েছে এস. এস. সি. পাশ শিক্ষকদের। এজন্যই নাকি ১১তম এর পরিবর্তে ১৩তম তে সন্তুষ্ট থাকতে হচ্ছে শিক্ষকদের। তাহলে, আলোচনার টেবিলের সেই কথা ভুলে গিয়ে কিভাবে আজ স্নাতক দ্বিতীয় শ্রেণিধারীদেরই শুধু ১৩তম গ্রেড দেয়ার পায়তারা চলছে?

যে দেশে স্নাতক তৃতীয় শ্রেণিধারী ব্যক্তি প্রথম শ্রেণির চাকরি করতে পারেন সেদেশেই স্নাতক দ্বিতীয় শ্রেণিধারী কেন তৃতীয় শ্রেণির চাকুরি করতে পারবেন না? প্রাথমিক বিদ্যালয়ের হাজার হাজার প্রধান শিক্ষক যেখানে এইচ. এস. সি. পাশ হওয়ার পরেও ১১তম গ্রেডে বেতন পান সেখানে সহকারী শিক্ষককে ১৩তম গ্রেড পেতে কেন স্নাতক দ্বিতীয় শ্রেণি পেতে হবে?

আসলে এটি একটি গভীর ষড়যন্ত্র ছাড়া আর কিছুই নয়। অধিকাংশ শিক্ষকরা ১৩তম পাবেন না। সঙ্গত কারণেই তারা আদালতের আশ্রয় নেবেন। অনন্তকাল মামলা চলতে থাকবে। ১৩তম গ্রেড বাস্তবায়নও হবে অলীক কল্পনা মাত্র। অল্প টাকায় কামলা খাটানোর ঠিকাদাররা সরকারের কাছে বাহবা পাবেন, পাবেন বিশেষ পুরস্কারও।

গতরাত থেকেই শিক্ষকদের দ্বিধাবিভক্ত হয়ে পোস্ট করতে দেখা যাচ্ছে। একজন শিক্ষক আরেকজন শিক্ষককের যোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন। ন্যূনতম সম্মানবোধ হারাতে বসেছেন খোদ শিক্ষকরাই। কার সার্টিফিকেট বৈধ কার অবৈধ এ নিয়ে শুরু হয়ে গেছে কামড়াকামড়ি। আমি নিজে এম. এ. ফার্স্ট ক্লাস (রা.বি.) কিন্তু এস. এস. সি. যোগ্যতা নিয়ে চাকরি থেকে অবসর নেয়া শ্রদ্ধেয় শিক্ষক নূর মোহাম্মদ খানের নিকট আমি কেবল নস্যি।

এখনও সময় পেলেই পায়ের ধুলো নিতে তাঁর বাড়ি ছুটে যাই। শিক্ষক নেতারাও নিজেদের সফলতা আর অন্য নেতাদের ব্যর্থতা নিয়ে প্রকাশ্যে পোস্ট দেয়া শুরু করেছেন। এ জায়গাটা একটু পরিষ্কার হওয়া দরকার। আমার মনে হয়, শিক্ষক নেতারা সামষ্টিকভাবে ১৩তম গ্রেড বাস্তবায়নের চেষ্টা করেছেন। যদিও ইদানিং কোন কার্যক্রম লক্ষ্য করা যায় নি। আর মুহাম্মদ মাহবুবর রহমান ভাই ১৩তম গ্রেড দ্রুত বাস্তবায়নের চেষ্টায় বিভিন্ন অফিসে যোগাযোগ করেছেন।

তিনি তাঁর একটি পোস্টে উল্লেখ করেছেন, ঢাকার কোন শিক্ষকই তাঁকে সঙ্গ দিচ্ছেন না। আসলে এটা দলীয় লেজুড়বৃত্তির চরম বহিঃপ্রকাশ। তিনি যদি কোন সমিতির ব্যানারে যেতেন তাহলে নিশ্চয় অনেকেই যোগাযোগ করতেন। পরিশেষে কর্তৃপক্ষের নিকট আকুল আবেদন, সকল সহকারী শিক্ষককে ১৩তম গ্রেড দেয়ার প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করুন।

২০২১ সালের মধ্যে প্রাথমিক শিক্ষাকে প্রকৃত মানসম্মত করতে হলে শিক্ষকদের প্রকৃত সম্মান দিতে হবে। পরিচালক হওয়ার ভূয়া স্বপ্ন না দেখিয়ে মানসম্মত গ্রেড ও উপজেলা শিক্ষা অফিসার পর্যন্ত পদন্নোতি দেয়ার প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহন করুন। প্রধান শিক্ষকের ১৮ হাজার পদে চলতি দায়িত্ব থেকে পূর্ণ দায়িত্ব দিন।

গত ৪ বছরে আপনারা কী কী করতে পেরেছেন, একটু হিসেব করে দেখে নিন। শিক্ষকপক্ষের নিকট আকুল আবেদন, আপনারা কামড়াকামড়িমূলক পোস্ট করা ও কমেন্টস করা থেকে বিরত থাকুন। শিক্ষক হয়ে আরেক শিক্ষককে অপমান করবেন না, প্লিজ।’

Ruhul amin Ridoy টাইম লাইন থেকে নেওয়া​