ফিনল্যান্ডের প্রাথমিক শিক্ষা পদ্ধতি

উত্তর মেরুর কাছাকাছি একটি দেশ ফিনল্যান্ড। হাজার হ্রদের দেশ নামেই পরিচিত। কিন্তু বেশ ক বছর হল ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরাম সহ বিভিন্ন রিপোর্টে তাদের পরিচয় এসেছে বিশ্বের শ্রেষ্ঠ শিক্ষা ব্যবস্থার দেশ হিসেবে।

কেমন তাদের শিক্ষার চালচিত্র? কীভাবে পড়ায় তাদের স্কুল-কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে? আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্রসহ আরও কত দেশকে পেছনে ফেলে কীভাবে তারা শিক্ষা ব্যবস্থায় সামনের কাতারে? কী এমন আছে তাদের? আমাদের সাথে কী কী পার্থক্য?

কোথায় রয়েছে মিল? ফিনল্যান্ডের শিক্ষা ব্যবস্থা অনুসরণের কথা বলছেন আমাদের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা! বাতিল করা হয়েছে ১ম- ৩য় শ্রেণীর পরীক্ষা! চলুন দেখে নিই সাংক্ষিপ্ত আকারে ফিনল্যান্ডের প্রাথমিক শিক্ষা পদ্ধতি!!

ফিনিশ শিশুরা ৭ বছরের আগে স্কুলের যায় না। এমনকি ৬ বছর পর্যন্ত তাদের স্কুলে ভর্তির অযোগ্য হিসাবে গণ্য করা হয়। অথচ আমাদের দেশে রাস্তাঘাটে প্রায়ই দেখা যায় ৩-৪ বছরের শিশুদের ভারবাহী গাধার মত পিঠে ব্যাগের মস্ত বোঝা চাপিয়ে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে স্কুলে।

শুধু তাই নয় এই অত্যাচার এমন মাত্রায় পৌঁছে গেছে যে অতিসম্প্রতি প্রাথমিক স্কুলের শিশুদের শরীরের ওজনের ১০ শতাংশের বেশি ভারী স্কুলব্যাগ বহন নিষেধ করে সুনির্দিষ্ট একটি আইন প্রণয়ন করতে নির্দেশ দিয়েছেন উচ্চ আদালত। দেরীতে হলেও এটি নিঃসন্দেহে একটি প্রশংসনীয় উদ্যো।

ফিনল্যান্ডের শিশুদের যে শুধু মোটা মোটা বইয়ের বোঝা বইতে হয় না তা কিন্তু নয় ১৬ বছর বয়সে ম্যাট্রিকুলেশন পরীক্ষার আগে এই দীর্ঘ ৯ বছর তাদের কোন ধরণের বার্ষিক পরীক্ষায়ও অংশগ্রহণ করতে হয় না। আরও মজার ব্যাপার হল সব স্কুলের কার্যক্রম শুরু হয় সকাল ৯:০০ থেকে ৯:৪৫ এর মধ্যে এবং সমাপ্ত হয় দুপুর ২:০০ থেকে ২:৪৫ এর মধ্যে।

এমনকি একই স্কুলে একেকদিন একেক সময়ে ক্লাস শুরু হয় অর্থাৎ বাঁধাধরা কোন নিয়ম নেই পাঠকার্যক্রম শুরু করার। শুধু তাই নয় ফিনিশরা মনে করে সকাল ৯টার আগে কোন ভাবেই ক্লাস শুরু করা উচিত নয়। স্কুলে সচরাচর দিনে তিন থেকে চারটি ক্লাস হয়। একেকটি ক্লাসের দৈর্ঘ্য ৭৫ মিনিট করে। প্রতি ক্লাসের পর ১৫ থেকে ২০ মিনিটের বিরতি দেওয়া হয় যাতে এই সময়ের মধ্যে পড়াটা আত্মস্থ করা যায় এবং কিছুক্ষণ হাঁটাচলা ও কথাবার্তার মাধ্যমে নতুন উদ্যমে পরের ক্লাসটা শুরু করা যায়।

প্রতি ক্লাসে শিক্ষার্থীর সংখ্যা থাকে গড়ে ১৫ থেকে ২০ জন। হোমওয়ার্কের পেছনেও ফিনল্যান্ডের শিশুদের ব্যয় করতে হয় অন্যান্য দেশের তুলনায় কম সময়। এখানে শিক্ষকের ভুমিকা মূলত দিক নির্দেশনা প্রদানকারী ইন্সট্রাক্টরদের মত। তারা বিভিন্ন ‘ইভেন্ট’ আয়োজন করেন, সেখানে সবার অংশগ্রহণ থেকে শেখার বিষয়টা নিশ্চিত করেন। বাড়ির কাজ বলে কিছু নাই, এই ধাপে ক্লাসেই সকল পড়াশুনা সমাপ্ত করা হয়। গতানুগতিক ক্লাসে প্রথম, দ্বিতীয়, তৃতীয় রোল নম্বর বলে কিছু নাই। সবার আইডি নম্বর আছে, কিন্তু পরীক্ষার সামগ্রিক ফলাফলে মেধাক্রম নাই।

ফিনল্যান্ডে স্কুলগুলোতে কোন ইউনিফর্ম নাই, যে যার পছন্দ মত জামা পরে আসবে। পি এস সি, জে এস সি এর মত কোন জাতীয় পরীক্ষা নাই এই ধাপে। আমাদের দেশে ছোট ছোট বাচ্চাদের প্রথম শ্রেণি তে ভর্তির জন্য যে যুদ্ধ করতে হয়, তা শুনলে হয়ত এরা আমাদের পাগল বলবে। পিতা মাতার স্বপ্নের জিপিএ – ৫ বা এ প্লাস (A+) না পেলে আমাদের দেশে একজন ছোট্ট শিক্ষার্থী পঞ্চম বা অষ্টম শ্রেণিতেই নিজেকে পরাজিত মনে করতে শুরু করে। অথচ এই শিক্ষার্থীর হয়ত কতই না সম্ভবনা ছিল!

সবার আগে জরুরী শিক্ষা সম্পর্কে আমাদের মানসিকতা পরিবর্তন করা। আমাদের দেশে শিক্ষকদের বেতন উশুল করতে গিয়ে রীতিমতো শিশু নির্যাতন করা হয়। শিশুদের আটকে রেখে গাদা গাদা বই পড়িয়ে আর জিপিএ পাঁচ দিয়ে যদি জ্ঞানী বানানো যেতো তাহলে অনেক আগেই আমরা ফিনল্যান্ডকে ছাড়িয়ে যেতাম! আমরা নয় ওরাই আমাদের অনুকরণ করত।