দেশের ৩৩ শতাংশ শিক্ষক পরিবারের মৌলিক চাহিদা পূরণে সফল নয়

শিক্ষকদের জীবনে নানা সংকট ডেকে এনেছে করোনা মাহামারি। প্রায় ৩৩ শতাংশ শিক্ষক পরিবারের সব মৌলিক চাহিদা পূরণ করতে পারছে না। অন্তত সাড়ে ৮ শতাংশ শিক্ষকের ঘরে বেশির ভাগ সময়ে এই ঘাটতি থাকছে। আর মাঝে মাঝে ঘাটতির শিকার হন ২৪ শতাংশ শিক্ষক। ২০১৯ সালের তুলনায় বর্তমানে সংকট চারগুণ বেড়েছে। মূলত করোনাকালে চাকরি হারানো ও উপার্জন কমে যাওয়ায় শিক্ষকরা এই পরিস্থিতির মধ্যে নিপতিত হয়েছেন।

একটি বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থার সম্প্রতির সমীক্ষায় এই চিত্র উঠে এসেছে।

অন্ন, বস্ত্র, শিক্ষা, চিকিৎসা ও বাসস্থানকে মৌলিক চাহিদা ধরা হয়ে থাকে। গত বছরের ৮ মার্চ দেশে প্রথম করোনাভাইরাস শনাক্ত হয়। ১৭ মার্চ সব ধরনের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ করে দেওয়া হয়। চলতি বছরের ১১ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সব ধরনের প্রতিষ্ঠানে এই ছুটি কার্যকর ছিল। ১২ সেপ্টেম্বর প্রাথমিক থেকে উচ্চ মাধ্যমিক স্তরের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান সচল হয়েছে।

আর এ মাসে খুলছে বিশ্ববিদ্যালয়। যেহেতু দেশের বেশির ভাগ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানই বেসরকারি, তাই উপার্জনের খরায় পড়ে যায় এগুলো। দীর্ঘ এই বন্ধে চাকরি হারান কেউ কেউ। চাকরি না হারালেও অনেকে এই সময়ে বেতন-ভাতা পাননি।

এছাড়া বেশকিছু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে যাওয়ায় সেগুলোর শিক্ষকদের আয় শূন্য হয়ে গেছে। সব মিলে শিক্ষকদের ঘরে হাহাকার দেখা দিয়েছে। যার নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে শিক্ষকের পরিবারের সদস্যদের মৌলিক চাহিদা পূরণে। এ প্রসঙ্গে বর্ষীয়ান শিক্ষক নেতা ও বাংলাদেশ অধ্যক্ষ পরিষদের (বিপিসি) সভাপতি অধ্যক্ষ মোহাম্মদ মাজহারুল হান্নান বলেন, শিক্ষকরা নানা বঞ্চনায় আছেন। করোনা মহামারি পরিস্থিতি আরও নাজুক করেছে।

বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের অনেক শিক্ষক ঠিক বেতন-ভাতা পাননি। অনেক কেজি স্কুল বন্ধ হয়ে গেছে। জীবনের প্রয়োজনে ওইসব প্রতিষ্ঠানের শিক্ষকরা পেশা বদল করতে বাধ্য হয়েছেন।

আবার বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের যারা সরকারি অনুদান হিসাবে এমপিও পান, তাদের অনেকে এ সময় আর্থিক সুযোগ-সুবিধা পুরোপুরি পাননি। দেশের গোটা শিক্ষাব্যবস্থার প্রায় ৯৫ ভাগই পরিচালনা করেন বেসরকারি শিক্ষকরা।

সেই হিসাবে বলা যায়, বেশির ভাগ শিক্ষকই বর্তমানে অতৃপ্তি ও অশান্তি নিয়ে পেশায় আছেন। একটি স্বাধীন দেশের জন্য বেসরকারি শিক্ষকতার এ অবস্থা অত্যন্ত লজ্জাজনক।

সুন্দর সমাজ, দেশ ও জাতি গঠনে গুণগত ও মানসম্পন্ন শিক্ষার কোনো বিকল্প নেই। আর এই শিক্ষা নিশ্চিতের ভার যার হাতে তিনি হলেন শিক্ষক।তাই জ্ঞান ও সৃজনশীল দিকের পাশাপাশি শারীরিক ও মানসিক দিক থেকে উপযুক্ত ও সুস্থ শিক্ষক পেতে হলে বঞ্চনা নিরসন করতেই হবে।

শিক্ষকদের বর্তমান জীবনমানসহ শিক্ষার বিভিন্ন দিক নিয়ে গণসাক্ষরতা অভিযান (ক্যাম্পে) যে সমীক্ষাটি করেছে, তাতে বলা হয়েছে-শিক্ষকদের পরিবারে মৌলিক চাহিদা পূরণ না হওয়ার অনুপাত ছিল ২০১৯ সালে ২ দশমিক ১ শতাংশ, যা চারগুণ বেড়ে ২০২০ সালে হয়েছে ৮ দশমিক ৫ শতাংশ।

এসব শিক্ষক বেশির ভাগ সময়েই পরিবারে মৌলিক চাহিদা পূরণের ক্ষেত্রে ঘাটতি থাকছে। তবে মৌলিক চাহিদা পূরণ করতে পারছেন ৬৭ দশমিক ৬ শতাংশ শিক্ষক; যা ২০১৯ সালে ছিল ৯২ দশমিক ৯ শতাংশ। অর্থাৎ এ ক্ষেত্রেও চারগুণের বেশি বেড়েছে সংকট।

আর মাঝে মাঝে ঘাটতিতে পড়েন ২৩ দশমিক ৯ শতাংশ শিক্ষক, যা ২০১৯ সালে ছিল ৫ শতাংশ। সমীক্ষা অনুযায়ী, সব মৌলিক চাহিদা পূরণে সংকটজনক অবস্থায় আছেন মাধ্যমিকের শিক্ষকরা। এই হার ৬২ দশমিক ৬ শতাংশ আর প্রাথমিকের শিক্ষক ৭২ দশমিক ৬ শতাংশ।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, শিক্ষক পরিবারে মৌলিক চাহিদা পূরণের ঘাটতি বা সংকটের মূল কারণ আর্থিক। প্রথমত শিক্ষকরা পর্যাপ্ত বেতন-ভাতা পান না। এছাড়া নানা ধরনের বৈষম্যের মধ্যে আছেন তারা।

এর একটি হচ্ছে- সরকারি-বেসরকারি নির্বিশেষে শিক্ষকদের মধ্যে বৈষম্য। এটি অবসানে শিক্ষাব্যবস্থার সব স্তরকে জাতীয়করণের দাবি দীর্ঘদিনের।

প্রবীণ শিক্ষক নেতারা বলছেন, বৈষম্য নিরসনে এক ও অভিন্ন ধারায় রূপান্তরিত করতে স্বাধীনতার পর বিভিন্ন সরকার নীতিগতভাবে একমত পোষণ করলেও আজও তা বাস্তবায়িত হয়নি।

শিক্ষকতা পেশা সামাজিক ও অর্থনৈতিক দিক থেকে মর্যাদাবান না হওয়ায় মেধাবীরা আকৃষ্ট হচ্ছে না। যে কারণে অন্য কোনো চাকরি না পেলে এই পেশায় আসেন অনেকে। বিষয়টি ১৭ সেপ্টেম্বর আওয়ামী লীগের শিক্ষক দিবসের আলোচনায় শিক্ষামন্ত্রী ডা. দীপু মনিও স্বীকার করেছেন।

শিক্ষক নেতাদের মতে, শিক্ষাকে বাঁচাতে হলে সরকারকে বেশকিছু উদ্যোগ নিতে হবে। এর অন্যতম হলো-‘শিক্ষা সার্ভিস কমিশন’ গঠন করে অভিন্ন নিয়োগ নীতিমালায় মেধাসম্পন্ন দক্ষ ও যোগ্য শিক্ষক নিয়োগ দেওয়া।

সরকারি শিক্ষকদের অনুরূপ বেসরকারি শিক্ষকদের নিয়মিত বেতন-ভাতা দেওয়া; যাতে আর্থিক অসচ্ছলতার কারণে প্রাইভেট টিউশনি, কোচিং বা অন্য কোনো বাড়তি কাজ করতে না হয়।

নিয়মিত পদোন্নতি দেওয়া, বিশেষ করে বেসরকারি শিক্ষকদের যোগ্যতা ও অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে পদোন্নতির ব্যবস্থা করা।