শিশুবান্ধব সময়সূচি প্রয়োজন প্রাথমিকে

আমরা প্রাথমিক শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা কোনো ধাঁচেই যেন পড়ি না। সম্মানজনক কোনো অবস্থান অদ্যাবধি আমরা তৈরি করতে সক্ষম হয়নি। যদিও আলাদাভাবেই প্রাথমিক শিক্ষা মন্ত্রণালয় বিদ্যামান আছে বেশ গুরুত্বের সাথেই। অথচ মাঠ পর্যায়ে আমরা মেষশাবক ছড়ানো রাখালের মত। যার যাওয়া হয় ভোরে কিন্তু আসার সময় হয় সূর্যাস্তের পরে! অদ্ভুত এক নিয়ম সব যেন চাপিয়ে দেওয়া হয় প্রাথমিক বিদ্যালয়ের আনন্দস্কুল নামের পুষ্পার্ঘ্যে।

উন্নত বিশ্বের দিকে তাকিয়ে দেখুন, তারা ইলিমেন্টারি স্কুলে শিশুদের সুঅভ্যাস তৈরি, সৎচরিত্র গঠন, শুদ্ধাচার ও নীতি নৈতিকতা শিক্ষা দিয়ে থাকেন। যা ভবিষ্যৎ সুনাগরিক হতে খুবই সাহায্য করে। কোনো পরীক্ষার বাধ্যবাধকতা নেই। নেই কোন মানসিক চাপ, মুখস্ত বিদ্যা ও শারীরিকভাবে বইয়ের বোঝা বহনের অতিরিক্ত পরিশ্রম।

আপনার সন্তানের সুন্দর উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ তৈরিতে কোনটা আপনি প্রাধান্য দেবেন কোয়ালিটি বা কোয়ান্টিটি? আমি একজন মা হিসেবে বলব সন্তানকে কোয়ালিটি শিক্ষা আগে দেয়া উচিত। যাতে বড় হয়ে সে সৎ, ন্যায়পরায়ন আর একজন সত্যিকার দেশসেবক, সমাজসেবক হতে পারে। অথচ আমরা প্রাথমিক বিদ্যালয়ে কিসের উপর জোর দেই? গৎবাঁধা পড়ালেখা, মুখস্ত বিদ্যা ও কয়দিন পরপর পরীক্ষা আর মূল্যায়ন কলমে-কাগজে। কারণ রেকর্ড করাই আসল উদ্দেশ্য আমাদের। অথচ একটি শিশু এসব বাড়তি কাজ ঝামেলা মনে করে।ওরা ভয় পায়।পরীক্ষার সময় কেঁদে কেটে অস্থির হয়ে যায়। বাধ্য হয়েই অনেক সময় তাদের মা-বাবাকে সন্তানের পাশে দাঁড়িয়ে থাকতে হয়। যদিও পরীক্ষার সময় অভিভাবক পরীক্ষা কক্ষে থাকার নিয়ম নেই।

এবার আসি, স্কুল সময়সূচি নিয়ে কিছু কথায়। মাঝে মাঝে আমার বড্ড হাসি পায় আবার খারাপও লাগে যে, এই ছোট মাসুম বাচ্চাগুলোকে আমরা শিক্ষকরা গিনিপিগের মতো বানিয়ে ফেলছি মনে হয়। ভোরে ধর্মীয় শিক্ষার জন্য মক্তবে পড়ে শিশুরা। সকালের নাস্তা খেয়েছ কী খায়নি আবার বইয়ের বোঝা নিয়ে স্কুলে দৌড়ঝাঁপের তাড়া! কোথায় গোসল আর কোথায় বিশ্রাম! তারপর সকাল ৯টা থেকে দুপুর ১টা পর্যন্ত একটানা (১ম-২য় শ্রেণি) সমাবেশ, শ্রেণি কার্যক্রম চলতে থাকে। আর ৩য় থেকে ৫ম শ্রেণি সেই সকাল নয়টা থেকে মাঝে বিরতি দিয়ে বিকেল চারটে পর্যন্ত। ভাবা যায়! মনে হয়, ওরাও শিক্ষকদের সাথে সাথে চাকরি করছে। কী পেরেশানি তাদের মাঝে! বিকেল হলেই ঝিমিয়ে পড়ে শিক্ষক, শিক্ষার্থী সবাই।

ব্রেনের কাজ এভাবে আসলে জোর করে বসিয়ে রেখে হয় না। তাতে শিখনফল, প্রান্তিক যোগ্যতা অর্জন করে গুটিকয়েক শিক্ষার্থী মাত্র। বাকীরা যেই লাউ সেই কদু হয়ে বসে থাকে সারাবছর। কোনো উর্ধতন কর্মকর্তা আসলে, কিছু জিজ্ঞেস করলে, এসব অমনোযোগী বিরক্তভাব নিয়ে থাকা শিক্ষার্থীরা কিছুই উত্তর দিতে পারে না। এদের নিয়ে শিক্ষকদের টেনশনের অন্ত থাকে না।কারণটা কী? আসলেই এত দীর্ঘ সময় কোনো শিশুই একটি জায়গায় অবস্থান করতে চায় না।শিশুদের মন চঞ্চল, দূর্বার।তারা চায় হাসতে, খেলতে আর মজা করে চলতে।আর আমরা তাদের পাখির খাঁচার মধ্যে বন্দি করে রাখি প্রায় সারাদিন।

শিশুরোগ ও মনো বিশেষজ্ঞদের মতে, এতে শিশুর স্বাভাবিক বিকাশ ব্যাহত হয়। শিশুর বেড়ে উঠার প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করা কোনোভাবেই আমাদের কাম্য নয়।

শিশুদের বেঁধে রাখার মনোভাব পরিত্যাগ করতে হবে।পুস্তকগত জ্ঞান একজন পরিপূর্ণ ভাল মানুষ হতে আমাদের উৎসাহিত করে না। কর্মক্ষেত্রে দুর্নীতি, ঘুষ আর অসৎ আচরণের বিস্তৃতি এজন্যই দেশকে রসাতলে নিয়ে যাচ্ছে। শুধু সার্টিফিকেট, মুখস্ত বিদ্যা শাস্ত্রীয় জ্ঞানকে আমরা প্রাধান্য দিই। একটি শিশু চারাগাছ।তাকে গোড়া থেকেই ভালেঅভাবে পরিচর্যা করতে হবে। নীতি নৈতিকতা ও সৎ চরিত্র এবং সুঅভ্যাস গঠনই প্রাথমিক শিক্ষার লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য হওয়া উচিত।

কাউন্টিং নির্ভর পড়ালেখা আমরা চাই না। অল্পসময় নিয়ে খেলার ছলে শিশু নিজেকে আবিষ্কার করুক, জানুক আর শিখুক। ক্লাস ঘন্টার কাঁটায় নয় বরং গুণগত শিক্ষা তিরিশ মিনিটেই সম্ভব বলে মনে করি। অযথা ঘন্টার পর ঘন্টা বিরক্ত নিয়ে বসিয়ে রাখার চেয়ে ফলপ্রসূ ক্লাস অল্প সময়েই মনে স্বতঃস্ফূর্ততা আনায়ন করবে বলে বিজ্ঞজনরা মনে করেন।

প্রাথমিক শিক্ষায় শিশুদের শ্রেণি কার্যক্রম দেড় থেকে দুই ঘন্টায় যথেষ্ট। শিশুদের ক্ষিদে লাগে ঘন ঘন। এটাও শিশুর লেখাপড়ার অমনোযোগীতার অনেক বড় অন্তরায়। তাই সবদিক বিবেচনা করলে প্রাথমিকে সকাল ১০টা থেকে দুপুর ২টা পর্যন্ত দুই শিফটে ক্লাস শেষ করা উচিত। এর বেশি কোনোক্রমেই শ্রেণি কার্যক্রম চালানো কোনো সুফল বয়ে আনবে না। অন্যথায় কাগজে কলমেই কেবল শিক্ষা আর নথিপত্র পরিপত্র জারির মাঝেই লৌকিক সফলতা দেখা যাবে। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে শিক্ষার মান গুণগত দিক দিয়ে অনেক পিছিয়ে পড়বে। শিক্ষকরা সমাজের আলো, জাতি গড়ার কারিগর। তাঁদের সম্মানের দৃষ্টিতে দেখলে কারো মনে এই অভিযোগ আসার কথা নয় যে, সকাল নয়টা থেকে চারটা পর্যন্ত শিক্ষকদের বেঁধে রাখলে বেতন উশুল হয়। এটি কোনো ব্যাংক নয়। অর্থনীতির সাথে শিশুর শিক্ষার কোনো লেনাদেনা নেই। তাই যেটুকু প্রয়োজন, সেটুকু সময় দিয়েই সফল, শিখনফল স্থায়ী ও ফলপ্রসূ প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সময়সূচি নির্ধারণ করা এখন সময়ের দাবি।

পারভীন আকতার, শিক্ষক, কবি ও প্রাবন্ধিক।